ফনেটিক ইউনিজয়
সংসদ নির্বাচনে দল ও প্রার্থীদের জবাবদিহিতা সম্ভব কি?

বাংলাদেশে আবার একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক সংসদ নির্বাচন হতে চলছে। প্রতিবারের মতো এই নির্বাচনে দল ও প্রার্থীদের আচরণবিধি নিয়ে অনেক কথা থাকবে, নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের অনেক করণীয় থাকবে। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য জবাবদিহিতা। এই নির্বাচনের জন্যেই পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র দীর্ঘসময় ধরে ব্যস্ত আছে ও থাকবে, রাষ্ট্রের প্রচুর টাকা ব্যয় হচ্ছে ও হবে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের একপাশে থাকবে প্রার্থী, আরেকপাশে ভোটদাতা বাংলাদেশের তথাকথিত মালিক জনগণ। কিন্তু এই নির্বাচন যদি কেবল কালো টাকার মালিকদের হয়, অথবা যদি ভোটকেন্দ্র দখল করে জাল ভোটের নির্বাচন হয়, অথবা যদি ভোট যাই হোক পূর্বসিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফল ঘোষণা করা হয়, তাহলে এই নির্বাচন হবে একটি তামাশা ও জনগণের উপর অত্যাচার। আর যদি ভোটাররা তাদের নিজ ভোট নিজে দিতে পারে এবং প্রদত্ত ভোটের সঠিক গণনা অনুযায়ী ফল ঘোষণা হয় তাহলে এই নির্বাচন হবে একটি পবিত্র অনুষ্ঠান এবং জনগণের উৎসব।     
আমরা বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে একটি পবিত্র অনুষ্ঠান হিসেবে দেখতে চাই। কারণ, এর মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন ৩০০ জন সদস্য, যারা জাতীয় সংসদে বসে দেশ পরিচালনার লক্ষ্যে আইন প্রণয়ন করবেন। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পবিত্র এই দায়িত্ব। এটাই বাংলাদেশের জাতীয় সংবিধান, যা রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়। এই সদস্যরা তাদের নির্বাচনী এলাকার জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবেন ও তাদের কথা জাতীয় সংসদে তুলে ধরবেন। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৭ বছর ধরে আমাদের জাতীয় সংসদ সদস্যরা কি তাই করে আসছেন? উত্তর হচ্ছে, না। আমাদের সংসদ সদস্যরা যা করেছেন তা মূলত তাদের দলীয় স্বার্থে, জনস্বার্থ বলে তা মোটেই বিবেচিত হয় না। তাই প্রশ্ন উঠতে পারে, সংসদ সদস্যরা জনগণের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা সম্পর্কে আদৌ ওয়াকিবহাল কি না।   
বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠন, পরিচালনা, আইন প্রণয়ন এবং আইন প্রণেতা সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব বিষয়ে আমাদের রাষ্ট্রের সংবিধানই ভিত্তি ও দিক-নির্দেশক। তাই এটি একটি পবিত্র দলিল। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সাংবিধানিক দলিল ১০ এপ্রিল ১৯৭১, প্রবাসী সরকার কর্তৃক দেয়া স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র। স্বাধীন বাংলাদেশে সংবিধান রচনার জন্য একটি ‘সংবিধান সভা’র প্রয়োজন ছিলো। এই সভার সদস্যরা কেবলমাত্র সংবিধান রচনার দায়িত্ব পেতেন ও সংবিধান রচনার পর ওই সভা বিলুপ্ত হতো। কিন্তু বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে ১৪ জানুয়ারি ১৯৭২ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন,  ১৯৭০ সালে তৎকালীন পাকিস্তান জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে বাংলাদেশের নির্বাচিত সদস্যদের সমন্বয়ে একটি গণ-পরিষদ গঠন করা হবে। যাঁরা খসড়া সংবিধান বিবেচনা ও অনুমোদন দেবেন। তিনি বলেন, সংবিধানে রাষ্ট্রীয় নীতির মূলভিত্তি হবে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রবাসী সরকার গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ঘোষণা করে, এর সাথে জাতীয়তাবাদ যোগ হয়।     
বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান রচিত হয় ১৯৭২ সালে, যা অনুমোদিত হয় ৪ নভেম্বর ১৯৭২। ওই সংবিধান যে গণপরিষদ অনুমোদন করে, তার সদস্যরা ছিলেন পাকিস্তানের জাতীয় ও প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। ওই আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ম্যান্ডেট ছিলো আওয়ামী লীগের ৬ দফার আলোকে পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থায় পূর্ব-পাকিস্তানের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক অন্যায়ভাবে লুটে নেয়া পূর্ব-পাকিস্তানের সম্পদ ফিরিয়ে আনা। যাই হোক, ১৯৭২ সালের গণপরিষদের দেয়া সংবিধানকে অনেকে আদর্শ বলে মনে করেন ও স্বাধীনতার চারদশক পরে তা’ ফিরিয়ে আনার জন্য বলেন। তবে ওই সংবিধানের ৬ ধারায় বাংলাদেশের নাগরিকদের ‘বাঙালি’ বলায় দেশের অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতীয়তার নাগরিকরা ক্ষুব্ধ হন। ধারা ৭০ এ জাতীয় সংসদে আনীত কোনো বিলে সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেবার অধিকার না দেয়ায় সংসদ সদস্যরা সরকার দলীয় নেতার আজ্ঞাবহ দাসে পরিণত হন। ঐ সংবিধানে  গণভোট এর গুরুত্বপূর্ণ বিধানটি না থাকায় সংসদ নির্বাচনে ভোট দেয়া ছাড়া সরকারের মেয়াদ অন্তর্বর্তী সময়ে জনগণের মত প্রদানের কোনো ক্ষমতা থাকলো না।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ ধারা অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেবার অধিকার না থাকায় বিগত ৪৭ বছরে সংসদ সদস্যরা তাদের এলাকার জনগণের স্বার্থরক্ষা বা প্রতিনিধিত্বের কিছুই করেননি। তাঁরা নির্বাচনে জয়ী হয়ে জাতীয় সংসদে সংসদীয় দল নেতা তথা সরকার প্রধানের ইচ্ছায় উত্থাপিত সকল বিলে হয় ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ বলেন। এভাবে তাঁরা দলীয় সকল কা- ও অপকা-ের অনুমতি দেন। এর বিনিময়ে সরকার প্রধান তাদের সংসদীয় এলাকার প্রতিনিধি নয়, প্রভু হবার অধিকার দিয়ে সরকারি সম্পদ ও অর্থ লুটপাটের ক্ষমতা দেন। তাই প্রশ্ন, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ভোট দিতে গিয়ে যে প্রতিশ্রুতি পান, তাঁদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বা দল কি তা পূরণ করে?     
বাংলাদেশের সংবিধানে আনা সংশোধনীসমূহ পর্যায়ক্রমে এই দেশকে একটি স্বৈরশাসনের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। ১৯৯০ এর গণ-অভ্যুত্থান দেশে জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠার একটি সুযোগ এনেছিল। বিগত ২০০৭ এর ১১ জানুয়ারি সামরিক হস্তক্ষেপে সরকার গঠিত হলে দেশবাসী কালো টাকার দাপটমুক্ত এক বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির উত্থান দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু সে সময়কার সামরিক শক্তি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগ/ বিএনপিকে পুনর্বাসিত করার জন্য গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ এর পরিবর্তন করে তিনটি অধ্যাদেশ জারি করে। যার ফলে কালো টাকার জোরে নির্বাচনী অঙ্গন দখল করা দলগুলির বাইরে নতুন দল প্রবেশের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। এভাবে ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচনী আইনে যে সংশোধনী আনে তা দেশকে গভীর তিমিরে প্রবেশ করিয়ে দেয়। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে ওই অধ্যাদেশগুলিকে বৈধতা দিয়ে সংশোধনী আইন পাস করায় অগণতান্ত্রিক কালাকানুন প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। আমরা হাইকোর্টে  রিট আবেদন করে (১৫৮০৩/১২) বলেছি, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২ (সংশোধিত-২০০৯) এর নিম্নবর্ণিত ধারাগুলি রাষ্ট্রীয় সংবিধানসম্মত নয়-
 ১. ধারা ১২(৩এ): জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে আবেদনের জন্য ১% ভোটারের পূর্বস্বাক্ষর গ্রহণ করতে হবে।
২। ধারা ৯০বি: নিবন্ধন পেতে রাজনৈতিক দলসমূহের কমপক্ষে এক তৃতীয়াংশ জেলায় দপ্তর থাকতে হবে এবং কমপক্ষে একশত উপজেলা বা মেট্রোপলিটন থানায় দপ্তরসহ কমপক্ষে ২০০ করে ভোটার সদস্য থাকতে হবে।    
আরপিও আদেশের এই ধারা দু’টি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সদস্যদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করেছে; যা বাংলাদেশের সংবিধানের ধারা ২৭ ভঙ্গ করে। যেখানে বলা হয়েছে সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী। আরপিও আদেশের ওই ধারা দু’টি নাগরিকদের সংগঠন করার অধিকার হরণ করে সংবিধানের ধারা ৩৮ এবং ধারা ৩৯(১) ভঙ্গ করেছে। ধারা দু’টি নাগরিকদের বাকস্বাধীনতা হরণ করে সংবিধানের ধারা ৩৯(২) ভঙ্গ করেছে। আমরা তাই মাননীয় হাইকোর্টকে ধারা দু’টি বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ঘোষণা করতে এবং বাংলাদেশের সংবিধানের ধারা ২৬ অনুযায়ী তা’দের বাতিল ঘোষণা করতে দাবি জানিয়েছি। হাইকোর্টের রায় আমরা এখনও পাইনি।
তাই আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দল ও প্রার্থীদের কাছে আমরা কি জনগণের হয়ে তাঁদের জবাবদিহিতা প্রত্যাশা করতে পারি? আমরা কি বলতে পারি, তাঁরা সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ পরিবর্তন করে সরকারের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপনের বিল বাদে সকল বিলে এলাকার জনগণের মত অনুযায়ী ভোট দেবেন? আমরা কি বলতে পারি, সংবিধানে নির্দেশিত স্থানীয় সরকারগুলিকে ক্ষমতা প্রদানের লক্ষ্যে তাঁরা আইন প্রণয়ন ব্যতীত অন্য কোনো বিষয়ে হস্তক্ষেপ আর করবেন না? আমরা দলগুলির নির্বাচনী ইশতেহারে জনগণের প্রতি দল ও প্রার্থীদের এসব বিষয়ে জবাবদিহিতার প্রতিশ্রুতি পেতে পারি কি?

আরো খবর

Disconnect