ফনেটিক ইউনিজয়
আলমগীর কবিরের জাতীয় মুক্তি ও জহির রায়হান
বিধান রিবেরু

আমরা যে আলমগীর কবিরকে চিনি, সাধারণভাবে, তার বাইরে আলমগীর কবিরের আরো বড় পরিচয় আছে- তিনি একজন দেশপ্রেমিক ও মুক্তিযোদ্ধা। গত শতাব্দীর ছয়ের দশকে তিনি শুধু ফিলিস্তিন ও আলজেরিয়ার মুক্তি সংগ্রামের সঙ্গেই নিজেকে যুক্ত করেননি, ‘ইস্ট বেঙ্গল লিবারেশন ফ্রন্ট’ নামের একটি গোপন সংগঠনও গড়ে তোলেন। বের করেন দু’টি পত্রিকা: এশিয়ান টাইড ও পূর্ব বাংলা। সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে পূর্ব বাংলার মানুষকে মুক্ত করতে হালকা অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণও নেন কবির।
দেশে ফিরে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতিকালে গ্রেফতার হন এবং ৬৬ সালে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। প্রায় একযুগ দেশের বাইরে কাটানো আলমগীর কবির যখন গ্রেফতার হন, তখন তিনি যুক্তরাজ্যের নাগরিক। তাই বেকায়দা দেখে তাঁকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় তৎকালীন প্রশাসন। পরে ১৯৭১ সালে সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন তিনি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ইংরেজি ভাষায় স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরির লক্ষ্যে নিয়মিত বেতারভাষ্য প্রচার করেন। জহির রায়হানের সঙ্গে মিলে পাকিস্তানি শাসক ও সেনাবাহিনীর বর্বরতা তুলে ধরার জন্য গেরিলা কায়দায় স্বল্প দৈর্ঘ্যরে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন তিনি।
 দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আলমগীর কবির নিজেকে যুক্ত করেন চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মকা-ে। সেসবের মূলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যেমন ছিল, তেমনি সমানভাবে জাগরুক ছিল একুশের চেতনাও। বায়ান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটির প্রভাব ও চেতনা নিয়ে দু’টি প্রবন্ধ লিখেছিলেন কবির- সেখান থেকেই তাঁর চেতনার উৎসমূল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। প্রবন্ধ দু’টির শিরোনাম       যথাক্রমে- ‘একুশের চেতনায় বাংলাদেশের নাটক ও চলচ্চিত্র’ (১৯৮২) ও ‘চলচ্চিত্রে একুশের চেতনা’ (১৯৮৫)।
১.
উল্লিখিত দুই প্রবন্ধেই কবির দৃঢ় কলমে লিখেছেন, যা তিনি বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অগ্রযাত্রায় একুশের চেতনার প্রভাব রয়েছে। আর একারণেই বাঙালি জাতিসত্তার উপস্থিতি চোখে পড়ে আমাদের সুস্থধারার নাটক ও চলচ্চিত্রে। তাঁর সমসাময়িক যারা সাংস্কৃতিক দুনিয়ার অগ্রদূত, তাঁদের প্রায় সবাই ভাষা আন্দোলনের সৈনিক ছিলেন, তাই বহন করেছেন রাজনৈতিক অঙ্গীকার। কবির শ্রদ্ধা নিয়ে স্মরণ করেন আলাউদ্দিন আল আজাদ, জহির রায়হান, কলিম শরাফী প্রমুখের নাম। তাঁদের প্রত্যেকেই একুশের চেতনাকে ধারণ করতেন বলে মনে করেন কবির।
একুশের চেতনার মৌলিক রূপরেখা কী রকম? এর উত্তর কবিরই দিচ্ছেন, ‘একুশের ভাষাবিপ্লব কেবল মাতৃভাষায় কথা বলা, বিদ্যা আহরণ বা অফিসের নথিপত্র রক্ষায় বাংলা ভাষার বাধ্যতামূলক প্রয়োগেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এর অন্তর্নিহিত মূল কারণ ছিল আর্থ-সামাজিক। অর্থাৎ, বাঙ্গালি জাতিসত্তাকে ঔপনিবেশিক কারাগার থেকে মুক্ত করে এই জাতির সামগ্রিক রাজনৈতিক তথা অর্থনৈতিক মুক্তির উদ্দেশ্যে প্রগতিশীল, আপসহীন এবং প্রয়োজনে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম পরিচালনায় মরণপণ সংকল্পই ছিল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য।’   (কবির ২০১৮: ৫২)
কারাগারে বসেই মুনীর চৌধুরী ‘কবর’ (১৯৫৩) রচনা করেন। এ নাটককে কবির মনে করেন ‘একুশের নিরঙ্কুশ চেতনার ফল’, আর এই নাটকের মধ্যদিয়েই নাট্যাঙ্গনে সূচনা হয় জাতীয় সংগ্রামভিত্তিক জঁরারপ। গতানুগতিক আঙ্গিককে ভেঙে ব্রেখটীয় কায়দায় নাটকটি মঞ্চস্থ হয় কারাগারের ভেতরেই। মুনীর চৌধুরীর মতো রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনাবোধ থেকে সেসময় কলম ধরেন সিকান্দার আবু জাফর, আলাউদ্দিন আল আজাদ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্সহ আরো অনেকে। এ থেকে বোঝা যায়, ভাষা আন্দোলন ও তার চেতনা রাজনৈতিক অঙ্গনে সীমাবদ্ধ ছিলো না, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনেও ছড়িয়ে পড়েছিলো। তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি সংসদের উদ্যোগে বহু রাজনৈতিক নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে। এভাবে পুরো দেশেই যেন নতুন জোয়ার আসে। কবির লিখছেন, ‘সংস্কৃতি সংসদের কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত হয়ে চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশালসহ বিভিন্ন এলাকায় নতুন ধরনের সমাজ সচেতন নাট্যাভিনয়ের ধুম পড়ে যায়।’ (কবির ২০১৮: ৫৭) তবে এ জোয়ার বেশিদিন টেকেনি। ‘পাকিস্তানি শোষণ এবং রাজনৈতিক দমনের চাপে ভাষা আন্দোলনের তরুণ যোদ্ধাদের উপযুক্ত উত্তরসূরির আবির্ভাব ষাটের দশকে হলো না। ফলে নাট্য আন্দোলন কেমন ঝিমিয়ে পড়ল।’ (কবির ২০১৮: ৫৮) তারপরও সাঈদ আহমদ ও রামেন্দু মজুমদারের প্রয়াস লক্ষ্য করেন কবির।
দেশ স্বাধীনের পর প্রগতিশীল ধারা অব্যাহত ছিল নাট্যাঙ্গনে। একুশ তথা বাঙালি জাতিসত্তা উন্মেষের চেতনা পরবর্তী সময়েও পরিবাহিত হয়েছে। চলচ্চিত্রাঙ্গনের আলাপে এসে অবশ্য আলমগীর কবির কিছুটা হতাশাই প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘একুশের চেতনার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বিজ্ঞজনের মুখে যদি শ্লেষাত্মক হাসির রেশ দেখি, তাহলে আশ্চর্য হব না।’ (কবির ২০১৮: ৫৯) দেশের ভাষা, কৃষ্টি, পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-ব্যবহার ইত্যাদি প্রতিফলনে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সৎ নয়, আর তাই প্রগতিশীল জাতীয় ভূমিকা পালনেও চলচ্চিত্র সফল নয় বলে মন্তব্য কবিরের। তিনি মনে করেন, এসব চলচ্চিত্র ‘গণবিরোধী ও প্রতিক্রিয়াশীল’।
কবির বলেন, ‘সাধারণ মানুষের সরল মন এবং ধর্মভীরুতার সুযোগ নিয়ে আমাদের শতকরা ৯৭টি ছবিই দর্শকের মানসিকতাকে নিম্নতম পর্যায়ে নামিয়ে, অপসংস্কৃতির আফিম খাইয়ে, তাদের সমাজ সচেতনতাকে যতদূর সম্ভব ভোঁতা করে দেবার জঘন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।’ (ঐ)
চলচ্চিত্র মুনাফা সর্বস্ব হয়ে উঠলেও, কবির মনে করেন, এ দেশের চলচ্চিত্রের সূচনা খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে হয়নি। বাংলাদেশের প্রথম দিককার চলচ্চিত্রের দিকে তাকালেই সেটা বোঝা যায়। তবে ষাটের দশকটা চলচ্চিত্রের জন্য একটু ভিন্নই ছিল বলে মনে করেন কবির। নাট্য আন্দোলনের মতো এ দশকে চলচ্চিত্র ঝিমিয়ে পড়েনি। বরং বলা যায়, জহির রায়হানের একক প্রচেষ্টায় চলচ্চিত্র গর্জে ওঠে পাকিস্তানি শাসকচক্রের বিরুদ্ধে।
কবির বলেন, ‘প্রগতিশীল রাজনীতির সাংস্কৃতিক কর্মী জহির রায়হান যেন দিব্যদৃষ্টিতে ইতিহাসের লিখন দেখতে পেল। পাকিস্তানি সামরিক শাসনকর্তাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তৈরি করল ‘জীবন থেকে নেয়া’ (১৯৭০)- বাংলাদেশের সর্বপ্রথম জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী চলচ্চিত্র।’ (কবির ২০১৮: ৬২) জহির রায়হানকে একুশের সৈনিক উল্লেখ করে কবির বলেন, যুদ্ধে ‘অস্ত্র হলো তার মুভি ক্যামেরা। তারই নেতৃত্বে সূচিত হলো স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন সিনেমা।’ (ঐ)
একুশের চেতনা সর্বোপরী জাতীয় মুক্তির চেতনাকে ধারণ করেই ‘স্টপ জেনোসাইড’ (১৯৭১), ‘লিবারেশন ফাইটার্স’ (১৯৭১), ‘ইনোসেন্ট মিলিয়নস’ (১৯৭১), ‘এ স্টেট ইজ বর্ন’ (১৯৭১), ‘ধীরে বহে মেঘনা (১৯৭৩) প্রভৃতি ছবিগুলো নির্মিত হয়েছে। স্বাধীনতার পর ‘ব্যাপারীদের বায়োস্কোপে’র চাপে সুস্থ চলচ্চিত্রের ধারা কোণঠাসা হয়ে পড়লেও একটা ক্ষীণ ধারার টিকে থাকা দেখতে পেয়েছিলেন কবির। আর এ সুস্থ ধারার ধারক-বাহককে কবির মনে করতেন বায়ান্নর একুশের প্রত্যক্ষ সৈনিক আর মানসপুত্র। শঙ্কাও ছিলো কবিরের, তিনি মনে করতেন, ‘এ ধারা চিরকাল টিকবে না, যদি না এর যোগ্য উত্তরসূরি সৃষ্টি করা যায়।’ (ঐ)
আলমগীর কবিরের এই প্রত্যাশার প্রেক্ষিতে প্রশ্ন তোলা যায়- যোগ্য উত্তরসূরি তৈরি হচ্ছে কি? এই প্রশ্ন জাগরুক রেখে চলুন আলমগীর কবিরের আরেক প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রবেশ করি।
২.
কেন মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবির? এই প্রশ্ন নিয়ে আমাদের মনের গ্রীবা উঁচু না হলেও আলমগীর কবির নিজেই এই প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন নিজের দিনলিপিতে- ‘মুক্তিযুদ্ধে কেন গিয়েছিলাম?’ উত্তর দেয়ার জন্যই এই প্রশ্ন করেন তিনি। উত্তরে প্রবেশের আগে বলে রাখা বাড়তি হবে না যে আলমগীর কবির হুট করেই দেশপ্রেমী ও মুক্তিযোদ্ধা হয়ে ওঠেননি। বায়ান্নর একুশের চেতনা যেমন সর্বদা বুকে ধারণ করেছেন, তেমনি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকের স্বরূপ বহু আগে থেকেই আঁচ করতে পেরে জড়িত হয়েছিলেন একাধিক মুক্তিকামী সংগঠনের সঙ্গে। সোচ্চার করতে চেয়েছেন পূর্ব-পাকিস্তানের শোষিত ও বঞ্চিত কণ্ঠস্বরকে।
লন্ডনের দ্য টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সম্পাদকীয় পড়ে আলমগীর কবির প্রথম ব্যাকুল হয়ে ওঠেন দেশের জন্য কিছু করতে। সেটি গত শতাব্দীর ছয়ের দশকের শুরুর ভাগ। সম্পাদকীয়তে তুলে ধরা হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তান দ্বারা পূর্ব বাংলার শোষণের ইতিহাসকে। আলমগীর কবির উল্লিখিত প্রশ্নের জবাবে এ প্রসঙ্গটি আনেন এবং সম্পাদকীয় পড়ার পর প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন ‘একাত্তরের ডায়েরি’তে। সম্পাদকীয়র উপসংহারে বলা হয়েছিল, ‘পশ্চিম এবং পূর্বাঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ১৯৮০ সাল পর্যন্ত যদি দেশের সমস্ত পূর্ব বাংলার উন্নয়নে ব্যয় করা হয়, তাহলেও দুই অঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক সমতা আসবে না।’ (কবির ২০১৮: ০৭)
অর্থনৈতিক বঞ্চনাকে রাজনীতি ও কর্মতৎপরতায় অনুবাদ করতে সময় নেননি কবির। ‘পূর্বসূরি’ নামের এক গোপন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান তিনি। এরপর বিলেতের চাকরি ছেড়ে দেন। পূর্ববঙ্গে শুরু হয়ে যায় স্বাধিকার আন্দোলন। অন্যান্যদের সহযোগিতা নিয়ে কবির গঠন করেন ‘পূর্ব বাংলা মুক্তিফ্রন্ট’। প্রকাশ করেন ‘পূর্ব বাংলা’ নামের এক পত্রিকা। সশস্ত্র যুদ্ধ করার মানসিকতা নিয়ে কবির ১৯৬৬ সালে চলে আসেন দেশে। সাংবাদিকতার পাশাপাশি চলে রাজনৈতিক তৎপরতা। ওই বছরই তিনি গ্রেফতার হন। বন্দি জীবন কাটান কেন্দ্রীয় কারাগারে। ঘটনার সাক্ষ্য কবিরের জবানে যেমন পাওয়া যায়, তেমনি পাওয়া যায় শেখ মুজিবুর রহমানের ‘কারাগারের রোজনামচা’তেও।
ফিরে আসি কবিরের প্রশ্নোত্তরে। কবির জানান, এপ্রিলে তিনি নরসিংদীতে পৌঁছান এবং যুক্ত হন সম্মুখ সমরে অংশ নেয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে। কিন্তু পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণে তারা বেশিদিন টিকতে পারেননি। তাই বাধ্য হয়ে কবির চলে যান আগরতলা। সেখানে গিয়ে তিনি সবার আগে যেটা বুঝলেন সেটা হলো, ‘আওয়ামী লীগ এ যুদ্ধের জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না। সামরিকভাবে তো নয়ই, এমনকি প্রশাসনিকভাবেও নয়। অর্থাৎ যুদ্ধ চালানোর মতো কোনো অর্গানাইজড মেকানিজম তাদের ছিল না।’ (কবির ২০১৮: ১৩) আর নেতৃত্ব নিয়ে মতানৈক্য তো ছিলই।
আগরতলা থেকে কলকাতা গিয়ে কবির শুরু করেন সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। এর মাঝে জুন নাগাদ প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের একটি বিশেষ বার্তা নিয়ে তিনি গোপনে ঢাকা আসেন। সেসময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণের মুখে পড়ে আহত হন কবির। কিছুদিন আত্মগোপন করেন আজিমপুর কলোনিতে। পরে আবার ঝুঁকি নিয়ে ব্যাংকক হয়ে কলকাতা পৌঁছান। সেখানে গিয়ে দেখেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তুলকালাম কা-। আর সেটা   হলো-পূর্ব বাংলার প্রথম ও একমাত্র ‘গেরিলা চলচ্চিত্র নির্মাতা’ জহির রায়হানকে নিয়ে। বেতারের জন্য একটি প্রবন্ধ লিখতে বলা হলে, জহির রায়হান সেটি কয়েকদিন টানা খেটে লিখে দেন। কিন্তু সেটা বাতিল করে ফেলে দেয়া হয় ময়লার ঝুড়িতে। এর কারণ- প্রবন্ধটি ছিল বেশি মাত্রায় সমাজতন্ত্র ঘেঁষা। প্রবন্ধটি ছুড়ে ফেলে দেয়ার বিষয়টি জেনে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন জহির রায়হান।
পরে অবশ্য কবিরের মধ্যস্ততায় স্বাধীন বাংলা বেতারের সঙ্গে জহির রায়হানের দূরত্ব কমে। শুধু তা-ই নয়, কবিরের চেষ্টাতেই সরকারের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা জহির রায়হানকে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়, যাতে যুদ্ধের পরিস্থিতি নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করা যায়। যদিও মাত্র ৪০ হাজার টাকাই হাতে পেয়েছিলেন জহির রায়হান। নিজে অর্থকষ্টে দিন কাটালেও সেই ৪০ হাজার টাকা দিয়েই তিনি নির্মাণ করলেন চারটি প্রামাণ্যচিত্র। সেগুলোর মধ্যে ‘স্টপ জেনোসাইড’ একটি।
এই ছবিটি নিয়েও যে সেসময় ‘রাজনীতি’ হয়েছে, সেটাও দুঃখের সঙ্গে স্মরণ করেন কবির। তথাকথিত কয়েকজন ‘আওয়ামী লীগার’ ছবিটি নিষিদ্ধ করার জন্য স্বাক্ষর অভিযান শুরু করেন। তাদের বক্তব্য ‘স্টপ জেনোসাইড’ কেন লেনিনের উক্তি দিয়ে শুরু হবে, কেন শেখ মুজিবুর রহমানের কথা দিয়ে শুরু হবে না? যুদ্ধকালীন সরকারকে মাসিক ‘সিনেমা’ পত্রিকার সম্পাদক ও চলিচ্চত্র নির্মাতা আবু তাহের মোহাম্মদ ফজলুল হক অনুরোধ করেছিলেন ‘স্টপ জেনোসাইড’ যেন প্রদর্শিত না হয়। তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে চিঠিতে লিখেছিলেন-
The film start with a photo of V.I. Lenin and with his wordings shows nothing but little of refugees in India and a little part of our liberation Army Training Camp. But the     serious setback is, in my opinion, that there is not a single shot or word about our beloved leader Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman of Awami League or, the six points.
...I, personally, protest against this film and I request you to immediate action to stop this film before it is shown to the public through the Indian Government. If it is not done, I alone, am ready to start a          movement. (হক ২০১৬: ১৩১-৩২)
এ চিঠির জবাবে জহির রায়হানের বক্তব্য ছিল স্পষ্ট। তিনি বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিবের কেস প্লিড করতে হলে লেনিনের মতো মহামানবের উক্তিই ব্যবহার করতে হবে। কারণ নিজের বক্তৃতা দিয়ে নিজের কেস প্লিড করা যায় না।’ (কবির ২০১৮: ২৮) ফজলুল হকের চিঠিটি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের কাছে। ভাগ্যিস বিষয়টি তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, নয় তো মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ দলিল ‘স্টপ জেনোসাইড’ হয়তো ভারতের কোনো মহাফেজখানার গর্ভে হারিয়ে যেত। পরে তাজউদ্দীন আহমেদের হস্তক্ষেপেই ছবিটি আলোর মুখ দেখে। অথচ পরিহাসের বিষয়, কবির বলছেন, জহির রায়হানের এ ছবিটি নিয়ে যিনি সবচেয়ে বেশি প্রতিবাদ করেছিলেন, যিনি সবচেয়ে বেশি নেতার প্রতি ভক্তি দেখিয়েছিলেন, সেই আবু তাহের মোহাম্মদ ফজলুল হকই কলকাতায় নতুন করে ঘরবাড়ি করে, সেখানেই নিজের ব্যবসা গুছিয়ে নিয়েছিলেন।
এসব ঘটনার ভেতরেই কবিরকে বাংলাদেশ সরকার তথ্য মন্ত্রণালয়ের চিফ রিপোর্টার হিসেবে নিয়োগ দেয়। আর একই সঙ্গে তাঁকে দায়িত্ব দেয়া হয় স্বাধীন বাংলা বেতারে ইংরেজি বিভাগের। সেখানে তিনি নিয়মিত কথিকা পাঠ করেছেন ইংরেজিতে। তবে বেতারেই নিজেকে নিয়োজিত রাখেননি কবির। জহির রায়হানের চারটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে তিনি ছিলেন প্রধান সহযোদ্ধা। এই চারটির মধ্যে কবিরের পরিচালনায় নির্মাণ হয় ‘লিবারেশন ফাইটার্স’। আরো দু’টি ছবি ‘এ স্টেট ইজ বর্ন’ ও ‘ইনোসেন্ট মিলিয়নস’ প্রযোজনা করেন জহির   রায়হান। এ দু’টোর মধ্যে প্রথমটির পরিচালকও ছিলেন জহির রায়হান।
এরই মধ্যে আরেকটি ঘটনা ঘটে। ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রের একটি প্রিন্ট নিয়ে যাওয়া হয় কলকাতায়। তখন এই ছবিটি প্রদর্শনের জন্য এক পরিবেশক, নাম নন্দ ভট্টাচার্য্য, অগ্রিম এক লক্ষ বিশ হাজার টাকা দেন। সেই টাকার পুরোটাই জহির রায়হান বাংলাদেশ সরকারকে দিয়ে দেন। শুধু তাই নয়, পশ্চিমবঙ্গে ছবিটি দেখানো বাবদ সব টাকাই তিনি দান করেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহারের জন্য। সরকার এই ছবির প্রদর্শন থেকে পাঁচ লক্ষাধিক টাকা আয় করেছিল। (চলবে)

আরো খবর

Disconnect