ফনেটিক ইউনিজয়
ফেসবুকে প্রেম: হ্যাঁ নাকি না?
শারমিন সেতু

কয়েক বছর আগেও প্রেমের মাধ্যম হিসেবে চিঠির অবদান ছিল অনস্বীকার্য। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে কাগজে-কলমে লেখা চিঠির জায়গা দখল করে নিয়েছে মোবাইলের ক্ষুদে বার্তা, ফেসবুকের ছবিবার্তা, ইমো, ভাইবারের ভিডিও চ্যাটিং ইত্যাদি। তবে ফেসবুক প্রেম বর্তমান সময়ে বেশ আলোচিত বিষয়। যদিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বেশির ভাগ প্রেম ব্যর্থ হতে দেখা যায় তবে অনেককে আবার প্রেমের টানে নিজ দেশ ছেড়ে ভিনদেশে পাড়ি জমাতেও দেখা যায়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো ফেসবুকের প্রেম কতটা যথার্থ? অবশ্য এর আগে জেনে নেই ফেসবুক প্রেমের ধারাটি।
আশার (কল্পিত) ফেসবুক প্রোফাইলের ছবি দেখে মুগ্ধ হয়ে অপরিচিত রফিক (কল্পিত) বন্ধুত্ব করতে প্রস্তাব পাঠায়। আশাও সাত-পাঁচ না ভেবে রফিকের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট গ্রহণ করে। এরপর তাদের মধ্যে শুরু হয় রাতজেগে কথা বলা। এরপর ভালোলাগা, তারপর প্রেম। প্রথম দিকে দু’জনের প্রতি দু’জনের প্রচ- বিশ্বাসও জন্ম নেয়। বাড়তে থাকে ঘনিষ্ঠতাও। এটি এমন পর্যায়ে চলে যায় তখন দু’জন দু’জনকে ছবি দেয়। রফিক যেভাবে বলে, আশা সেভাবেই ছবি পাঠায়। এভাবেই চলছিল তাদের। এক সময় আরও কাছে আসতে চায় তারা। ছবি দেখে কথা বলে আর ভালো লাগছিল না। সামনা সামনি দেখা করার সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রথমে দু’জন পার্কে দেখা করে। পরে রফিকের বন্ধুর বাসায়, কখনো আবার আবাসিক হোটেলে। প্রেমে তখন দু’জনই মশগুল। ততদিনে ফেসবুকে দু’জনের রিলেশনশিপের স্ট্যাটাস সিঙ্গেল থেকে পরিবর্তিত হয়ে ‘ইন এ রিলেশনশিপ’ এ রূপ নিয়েছে। দু’জনেরই ফেসবুক স্ট্যাটাসে উঁকি মারে ‘জীবনটা এতো সুন্দর কেন, তার সঙ্গে মধুর সময় পার করলাম, পেয়ে গেছি তারে’ টাইপের পোস্ট। সব ঠিকই ছিল, কিন্তু বিপত্তি বাধলো তখন যখন রফিক বার বার আশাকে বন্ধুর বাসায় ডাকতে থাকলো। প্রথমদিকে আশা তাতে সম্মতি দিলেও পরে হ্যাঁ বলতে পারছিল না। সুযোগ নিলো রফিক। কারণ দু’জনের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের কিছু ছবি ও ভিডিও সে আগেই তুলে রেখেছিল। যদিও সে সময় রফিক আশাকে জানিয়েই কাজটি করেছিল। কিন্তু আশা ভেবেছিল ভালোবাসার মানুষ, ছবি তুললেই বা কী? অথচ এই ছবিগুলোই তার জীবনে পরবর্তীতে কাল হয়ে দাঁড়ায়।
আমাদের দেশে আশা ও রফিকের এমন প্রেম বর্তমানে সকলেরই জানা। শুধু এমনটাই নয়, প্রেমের অভিনয় করে ছেলে বা মেয়েকে ফাঁদে ফেলে। টাকা পয়সা হাতিয়ে নেয়া, অপহরণ এমনকি এসব নিয়ে খুনোখুনি থেকে শুরু করে আত্মহননের মতো ঘটনাও ঘটছে। এসব ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত।

ফেসবুক প্রেমে সতর্কতা
সব বিষয়েরই ভালো ও মন্দ দু’টি দিক থাকে। আবার ফেসবুক আমাদের নিত্যসঙ্গী হওয়ায় এখানকার সম্পর্ককে এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ কম। তবে এক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা ভালো। যেমন-
-কাউকে ফেসবুকের বন্ধু তালিকায় যোগ করার আগে তার প্রোফাইল ভালোভাবে যাচাই করে নিতে হবে।
-কাউকে ভালো লেগে গেলে তাকে প্রস্তাব দেয়ার আগে তার সম্পর্কে বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজখবর নেয়া জরুরি। প্রয়োজনে মিউচ্যুয়াল বন্ধুর মাধ্যমেও খোঁজ নেয়া যেতে পারে।
-ফেসবুকে কেউ তথ্য গোপন করলে তা বুঝতে পারা কঠিন। তাই ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
-সম্পর্ক যত গভীরই হোক না কেন ফেসবুকে খুব বেশি ঘনিষ্ঠ কথাবার্তা না বলাই ভালো। প্রতারকরা এসবের স্ক্রিনশট নিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে।  
-কেউ ভালো সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে আপত্তিকর প্রস্তাব দিলে স্ক্রিনশট নিয়ে রাখতে হবে। এটি তার বিরুদ্ধে নেয়া পদক্ষেপে প্রমাণ হিসেবে কাজে দেবে।
-ব্যক্তিগত আলাপগুলো ইনবক্সে করা উচিত। রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস পরিবর্তন করার আগে সম্পর্কের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে।
-সম্পর্ক খুব ভালো হলেও আইডি’র পাসওয়ার্ড কাউকে না দেয়াই ভালো। এতে ব্যক্তিস্বাধীনতা খর্ব হয়।
-অপরিচিত কারো সঙ্গে ভিডিও চ্যাট করলে বাজে কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক  তৌহিদুল হক বলেন, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক সময় একজন পুরুষ বা নারী সম্পর্কে ভুল তথ্য দেয়া থাকে। পরে সঠিক তথ্য প্রকাশ্যে আসলে ঝামেলার সূত্রপাত হয়। আবার অনেকেই কেবল যৌন সম্পর্কের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সম্পর্ক তৈরি করেন। তাই সবকিছু জেনে বুঝেই কোনো সম্পর্কে জড়ানো উচিত। সবচেয়ে ভালো হয় এ ধরনের সম্পর্ককে এড়িয়ে চলা।

Disconnect