ফনেটিক ইউনিজয়
শীতকালে স্বাস্থ্য সুরক্ষা
ডা. আশফাক হাবিব

তীব্র শীতে শুধু জীবনযাত্রায় নয়, স্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব পরে। এ সময় অনেকেই নানান ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগেন। সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয় গর্ভবতী নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের। শীতকালে ঠাণ্ডাজনিত বিভিন্ন সমস্যা যেমন জ্বর, হাঁচি, সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কিওলাইটিস, কনজাংটিভাইটিস, কোল্ড ডায়রিয়া, আমাশয়, খুশকি, ত্বকের সমস্যা, খোশপাঁচড়া বাড়ে। তবে একটু সতর্ক থাকলেই এ সমস্যাগুলো প্রতিরোধ করা যায়।

গর্ভবতী মায়ের যত্ন
শীতে সাধারণত মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং প্রসূতি মায়েরা একটি বিশেষ অবস্থায় থাকেন। এ কারণে তাদের একটু বেশি সতর্ক থাকতে হয়। ঠাণ্ডা লেগে নিউমোনিয়া, হাঁপানি, বাতের ব্যথার মতো সমস্যাগুলো বেড়ে যায়। যেহেতু গর্ভকালীন সময়ে মায়ের যে কোনো অসুস্থতা তার গর্ভের সন্তানের উপর প্রভাব পড়ে, তাই সতর্ক থাকতে হবে যেন কোনোভাবেই তাদের ঠাণ্ডা না লাগে। এজন্য ঠিকমতো গরম কাপড় পরিধান করতে হবে। তবে পেটের উপর চাপ পড়ে এবং চলাফেরা করতে সমস্যা হয় এমন পোশাক পড়া যাবে না। লম্বা ও সামনের দিকে  বোতাম আছে এমন সোয়েটারগুলো গর্ভবতী মায়েদের আরাম দিতে পারে। পাশাপাশি পা ভালোভাবে ঢাকা থাকে এমন জুতা ও মোজা পরে থাকতে পারেন। গর্ভকালীন সময়ে মায়েদের পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার বেশি বেশি খেতে হবে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে  সন্তানের ওপরও।
শীতকালে বাজরে লাউ, শিম, মুলা, গাজর, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, লালশাক, পালংশাকের মতো সবজিগুলো প্রচুর পাওয়া যায়। এ সময় গর্ভবতী মায়েদের ভাত কম খেয়ে এসব শাক-সবজিই বেশি করে খাওয়া জরুরি। পাশাপাশি প্রচুর পানি খেতে হবে। ফ্রিজের খাবার গরম না করে খাওয়া ঠিক হবে না।

বয়স্কদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা
শীতে বয়স্কদের কষ্টের সীমা নেই। এ সময় তাদের মধ্যে হার্টঅ্যাটাক, স্ট্রোক ও শ্বাসনালির প্রদাহ বেড়ে যায়। ছড়িয়ে পড়া ফ্লু থেকে নিউমোনিয়া হয়। অ্যাজমা, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, অস্টিওআর্থ্রাাইটিস ও যে কোনো জয়েন্ট ব্যথার জটিলতা বাড়ে। ভাইরাস জ্বর ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন অনেকেই। বৃদ্ধদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় একটু ঠাণ্ডায় বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। তাই শীতের ঠাণ্ডা থেকে দূরে থাকতে হবে তাদের। এজন্য শীতবস্ত্র ঠিকঠাক পরিধান করতে হবে। ঠাণ্ডায়  বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। শুধু শুয়ে বসে না থেকে হালকা ব্যায়াম যেমন ঘরের মধ্যে হাঁটাহাঁটি, হাত-পা নাড়াচড়া করতে পারেন। এতে শরীরে তাপ উৎপন্ন হবে। ঠাণ্ডা খাবার পরিহার করতে হবে। কুসুম গরম পানি পান করা ভালো। গরম চা, কফি খেলে গলায় ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস সহজে জন্মাবে না। প্রতিদিন অন্তত একটি টক ফল খেতে পারেন। বয়স্করাও ত্বকের সুরক্ষায় ময়েশ্চারাইজার যেমন ভ্যাসলিন, গ্লিসারিন, অলিভ অয়েল ও  সরিষার তেল ব্যবহার করতে পারেন। নিয়ম মেনে চললে শীতকালেও বয়স্করা সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন।

শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা
ঋতু পরিবর্তনের কারণে শীতকালে শিশুরা খুব অল্পতেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। এমনিতেই শিশুর যত্নে সব সময় সজাগ দৃষ্টি রাখতে হয় আর শীতকালে চাই শিশুর বাড়তি যতœ। কারণ এ সময় ভাইরাস ঘটিত সমস্যাগুলো শিশুর স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ।
তাই হেলাফেলা না করে শিশুকে উপযুক্ত আরামদায়ক ও কিছু বাড়তি গরম কাপড় গায়ে  দিতে হবে। শিশুদের জন্য কয়েক জোড়া শীতের কাপড় ব্যবহার করা ভালো এবং দুই থেকে তিন দিন অন্তর অন্তর তা পরিষ্কার করে ভালো করে রোদে শুকিয়ে নিতে হবে। এ সময় কুসুম গরম পানিতে শিশুর হাত ধুয়ে দিতে পারেন, কারণ ঠাণ্ডা লাগার ভয়ে শিশু ভালোভাবে হাত না ধুলে সর্দি, কাশি ও নিউমোনিয়ার জীবানুতে আক্রান্ত হওয়ার ভয় থাকে। শীতকালে শিশুরা স্কুলে অন্যদের মাধ্যমে কিছু ছোঁয়াচে চর্মরোগে আক্রান্ত হতে পারে। তাই তাদের ত্বকের যত্নও নিতে হবে বিশেষভাবে। নিয়মিত লোশন লাগাতে হবে ত্বক যেন শুষ্ক হয়ে না যায়। এ সময় বেশি বেশি ফলমূল, শাকসবজি ও সুষম খাদ্য খাইয়ে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো নিশ্চিত করতে হবে। এতে শিশুর শুধু শীতের রোগ না বরং অন্য সকল রোগের ঝুঁকিও কমে যাবে।

লেখক- চিকিৎসক
ইব্রাহিম জেনারেল হাসপাতাল, মিরপুর-৬, ঢাকা।

Disconnect