ফনেটিক ইউনিজয়
‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতা ফিরে এসেছে!
আহমেদ শরীফ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন
----

ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাশিয়া ইউক্রেনের সঙ্গে সীমান্তে প্রচুর সৈন্য, ট্যাঙ্ক ও আর্টিলারি মোতায়েন করেছে। ইউক্রেনের ধারণা, রুশ সামরিক বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে নতুন করে অভিযান শুরু করতে পারে। তবে সমর বিশ্লেষকরা বলছেন, সেখানে কয়েক হাজার রুশ সৈন্য মোতায়েন রয়েছে গত পাঁচ বছর ধরেই। পূর্ব ইউক্রেনের ডোনেৎস অঞ্চলে ইউক্রেনের সঙ্গে রুশ সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সংঘর্ষের জের ধরেই এই সমাবেশ। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো ইউক্রেন সরকারের এই দাবিকে সমর্থন করেনি, যদিও রাশিয়ার সঙ্গে উত্তেজনায় তারা ইউক্রেনের পক্ষে থাকার কথা বলেছে সবসময়। নভেম্বরে কৃষ্ণ সাগরে ইউক্রেনের জাহাজের সঙ্গে রুশ যুদ্ধজাহাজের সংঘর্ষের পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট প্রেট্রো পরোশেঙ্কো রুশ সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে জরুরি অবস্থা জারি করেন।  
ন্যাটো ইউক্রেনের দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করলেও সংস্থাটির সেক্রেটারি জেনারেল জেন্স স্টলটেনবার্গ রুশ সামরিক কার্যকলাপকে নতুন কোনো আগ্রাসী কর্মকা-রূপে দেখছেন না। যুক্তরাষ্ট্রও ইউক্রেনের দাবির ব্যাপারগুলোতে ধীরে চলার নীতিতে রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আনা আরুটুনিয়ান বলেন, দুই দেশের সীমান্তে সামরিক সমাবেশের সঠিক কূলকিনারা করা বেশ কঠিন। ইউক্রেন বলছে, রাশিয়া তাদের সীমান্তে ৮০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। আরুটুনিয়ান বলছেন, এটি সমগ্র দক্ষিণ রাশিয়ায় স্বাভাবিকভাবে মোতায়েনকৃত সকল সৈন্যের সংখ্যাও হতে পারে। অন্যদিকে, রুশ পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেন, ইউক্রেনই রাশিয়ার সীমান্তে যুদ্ধপ্রস্তুতি নিচ্ছে এবং এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট পরোশেঙ্কো ইউক্রেনে জনমত সৃষ্টি করে আগামী মার্চে নির্বাচন জিততে চাইছেন। আসলে কে, কাকে চাপে ফেলে কী উদ্দেশ্য হাসিল করতে চাইছে, তা নিয়ে এখন নানামতের ছড়াছড়ি। তবে রুশ আগ্রাসন মোকাবিলায় ইউক্রেনের যুদ্ধপ্রস্তুতিই  হোক, আর ইউক্রেনের জরুরি অবস্থা ঘোষণার কারণে রুশ যুদ্ধপ্রস্তুতিই হোক, ইউক্রেন-রাশিয়া সীমান্ত এবং কৃষ্ণ সাগর সংলগ্ন আজভ সাগরে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। পশ্চিমা চিন্তাবিদরা বলছেন, ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতা আবারও ফিরে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের সমর্থনে কৃষ্ণ সাগরে গোয়েন্দা বিমান উড়িয়ে রাশিয়াকে ত্যাক্ত করা ছাড়াও নৌবাহিনীর একটা ডেস্ট্রয়ার পাঠিয়েছে। একইসাথে ইউক্রেনের দুর্বল নৌবাহিনীকে পুরনো দুইটা ফ্রিগেট দেয়ার কথাও তারা বলেছে। যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সঙ্গে এই প্রতিযোগিতাকে অন্য এক ধারায় নিয়ে আসে, যখন ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে মার্কিন  নৌবাহিনীর একটি ডেস্ট্রয়ার রাশিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান নৌঘাঁটি ভøাদিভোস্টকের কাছ দিয়ে ঘুরে আসে। এর জবাবে পরের সপ্তাহে রাশিয়া ভেনিজুয়েলায় পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম দূরপাল্লার তুপোলেভ-১৬০ বোমারু বিমান পাঠায়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল প্রতিবাদের মাঝে রাশিয়া বিমানগুলোকে দ্রুতই ফিরিয়ে আনে। তবে রুশ দূরপাল্লার বিমানবহরের কমান্ডার সের্গেই কোবাইলাশের এক রিপোর্টের বরাত দিয়ে বার্তাসংস্থা তাস জানায়, রুশ বিমানবহরের ভেনিজুয়েলা সফর সফল হয়েছে।
এখানেই শেষ নয়। গত অক্টোবরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ১৯৮৭ সালে ঠা-া যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে করা মধ্যম-পাল্লার পারমাণবিক অস্ত্র (আইএনএফ) চুক্তি থেকে সরিয়ে নেবেন। কারণ হিসেবে তিনি বলছেন, রাশিয়া বহুদিন থেকেই সেই চুক্তির বরখেলাপ করেছে। তবে রাশিয়া এই চুক্তি ভঙ্গের কথা অস্বীকার করেছে। সংবাদসংস্থা এপি জানায়, ক’দিন আগে রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিসের কাছে আইএনএফ চুক্তি নিয়ে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন। রাশিয়া বলছে, যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি থেকে সরে আসলে বৈশ্বিক ক্ষেত্রে তা ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্র প্রসারের হুমকি তৈরি করবে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকেই রাশিয়ার উপর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবরোধ চলছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যের ব্যাপক দরপতনের পর থেকে রাশিয়া অর্থনীতি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। সম্প্রতি সৌদি রাজপরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ার মাধ্যমে রাশিয়া তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। কিন্তুযুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব তেলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে দর ঊর্ধ্বমুখী হয়নি। মোটকথা তেলের মূল্য রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতার আরেকটি ক্ষেত্র হয়েই থাকছে। এর বাইরে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপ অভিযোগের সুরাহা হয়নি এখনও। সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়েও দুই শক্তিশালী দেশের মাঝে চলছে দরকষাকষি। এমনকি আফগানিস্তানের রাজনীতিতে প্রবেশের মাধ্যমে সেখানেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে রাশিয়া।
এতোকিছুর পরও ইউক্রেনের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের রাখঢাক রেখে এগুনোর ব্যাপারটা বলে দিচ্ছে যে, এই মুহূর্তে তারা রাশিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা বাড়িয়ে কোনো সংঘাতে যেতে ইচ্ছুক নয়। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমার সাথে সাথে চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বৃদ্ধি এবং ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য প্রতিযোগিতার ফলে আন্তর্জাতিক পরিসরে যুক্তরাষ্ট্রের কাজের তালিকা বেশ বড়।
অন্যদিকে ভেনিজুয়েলা থেকে দ্রুত বোমারু বিমানগুলোকে ফেরত আনার মাধ্যমে রাশিয়াও তাদের স্বল্পমেয়াদি জাতীয় লক্ষ্যের কথা জানান দিচ্ছে।     স্বল্প-মেয়াদ বা মধ্য-মেয়াদেই হোক, ভূ-রাজনৈতিক চিন্তাবিদরা বলছেন, ২০১৯ সালে এই ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতা আরও বৃদ্ধি পাবে।

Disconnect