ফনেটিক ইউনিজয়
প্রশ্নবিদ্ধ ‘মোদি ম্যাজিক’
স্বর্ণা চৌধুরী

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ভারতের বিধানসভা নির্বাচনগুলোর একটিতেও জিততে পারেনি কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। দেশটির জাতীয় নির্বাচনের পাঁচ মাসেরও কম সময় আগে এমন ফলাফলে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একক নেতৃত্ব বা ‘মোদি ম্যাজিক’। মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, রাজস্থান, তেলেঙ্গানা ও মিজোরাম রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবি নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপি’র জন্য বড় ধরনের হুঁশিয়ারি। নিশ্চিতভাবেই ম্লান হয়েছে ‘মোদি ম্যাজিক’।
‘আচ্ছে দিন’ (শুভ দিন) আর ‘আব কি বার, মোদি সরকার’ (এবার, মোদি সরকার) স্লোগান দিয়ে ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদিকে সামনে তুলে ধরা হয়। এর জোরেই সে যাত্রায় বিজেপি নির্বাচনে জয়লাভ করে। এরপর মোদিকে প্রচারণার কেন্দ্রে রেখে বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বিজেপি। ২০১৪ সালে যেখানে পাঁচটি রাজ্যে ছিল বিজেপি’র সরকার, সেখানে এখন ১৫টি রাজ্যে ক্ষমতাসীন তারা। আর এসব নির্বাচনে সাম্প্রদায়িক উস্কানি, মুসলিম বিদ্বেষ, দলিত বিদ্বেষই ছিল ‘মোদি ম্যাজিক’-এর মূল হাতিয়ার। আর এ প্রচারণার প্রদায়ক হিসেবে বিজেপি প্রধান অমিত শাহকে বলা হয় ‘কিং মেকার’!
মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড় ও রাজস্থানে কংগ্রেসের বিজয় নিশ্চিতভাবেই রাহুল গান্ধীর ভাবমূর্তি অনেক বাড়িয়ে দেবে। মাত্র একবছর আগে দলীয় প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করা রাহুলের জন্য এ সাফল্যের ভার বহন করাটাও এক বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ অনেকেই এখন তাকে নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তি ইমেজের বিপরীতে দাঁড় করাতে চাইবে। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, ব্যক্তি মোদির জনপ্রিয়তা এখনো এতটা নেতিয়ে   পড়েনিÑ বরং তাকে মোকাবিলা করতে কংগ্রেসকে হাজারো মতভিন্নতা থাকা দলের সঙ্গেও জোট গঠন করতে হচ্ছে।
বৃহৎ জোট গঠনের কৌশলটাই এবারের নির্বাচনে বড় বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে। অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ভিজিটিং ফেলো রশিদ কিদওয়াই বলেন, মহাজোট গঠনের প্রচেষ্টা এখন গতি পাবে। কিন্তু মোদিকে হারাতে হলে জোটের আঞ্চলিক দলগুলোকে নিজ নিজ রাজ্যে ভালো করতে হবে এবং বিজেপি’র বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াইয়ে জয়ী হতে হবে কংগ্রেসকে। বিজেপি’র ঐতিহ্যগত ঘাঁটিগুলো থেকে দলটিকে বিদায় করতে পারার কারণে কংগ্রেসের নেতৃত্বে একটি মহাজোট গঠনের জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালানো আঞ্চলিক দলগুলোকে আরো সাহসী করবে।
এ নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো- হিন্দি বেল্টের তিনটি রাজ্যে বিজেপি’র গো-রক্ষা, গো-নজরদারির মতো সাম্প্রদায়িক ধারার কৌশলগুলো খুব একটা কাজে লাগেনি। এসব রাজ্যে বিজেপি’র নির্বাচনী প্রচারণায় কৃষি, বেকারত্বের মতো অর্থনৈতিক ইস্যুগুলো গুরুত্ব দেয়া হয়নি। তাছাড়া গান্ধী পরিবারের উপর বিজেপি নেতাদের ব্যক্তিগত আক্রমণকে ভোটাররা ভালোভাবে নেয়নি। উত্তর প্রদেশের বুলন্দশহর জেলায় সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনের ফলে যে মেরুকরণ ঘটে, তাও বিজেপি’র বিরুদ্ধে কাজ করেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।
কোনো না কোনোভাবে প্রতিটি কমিউনিটিই মোদি আমলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে আক্রান্ত হয়েছে। গুজরাট, উত্তর প্রদেশসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দলিত ও মুসলিমরা হিন্দুত্ববাদী আক্রমণের শিকার হয়েছে। আবার অর্থনীতি ও কৃষিনীতির কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কৃষকরা আক্রান্ত। গ্রামাঞ্চলে বিজেপি’র সবচেয়ে বড় পরাজয় হয়েছে। মোদি সরকারের কৃষি নীতির বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা কৃষক অসন্তোষ নির্বাচনে প্রধান নির্ধারক ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। চাষাবাদের খরচ কমানো এবং কৃষিজাত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার প্রতিবাদ ও কৃষিঋণ মওকুফের দাবিতে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের লাখো কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ গত ৩০ নভেম্বর রাজধানী দিল্লিতে দেশটির পার্লামেন্ট অভিমুখে মিছিল ও সমাবেশ করেন। গত বছর কৃষিজাত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির দাবিতে মধ্যপ্রদেশের কৃষকরা আন্দোলন করেছিলেন। ওই আন্দোলন দমাতে পুলিশের গুলিতে অন্তত ছয়জন কৃষক নিহত হন। এছাড়াও সরকারের বহু ব্যর্থতার কারণে মোদি সরকারের হিন্দুত্ববাদী বিদ্বেষের রাজনীতি এবারের নির্বাচনে সুফল বয়ে আনতে পারেনি। ক্ষমতায় আসার আগে মোদির করা বেশকিছু প্রতিশ্রুতির মধ্যে অন্যতম       ছিলÑ বিদেশ থেকে ‘কালো টাকা’ ফিরিয়ে এনে তা সাধারণ মানুষদের স্বার্থে ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি। অথচ নীরব মোদি, বিজয় মালিয়াদের মতো শিল্পপতিরা হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পালালেও, বিদেশ থেকে কোনো টাকা ফিরিয়ে আনা হয়নি।
বেকারত্ব সমস্যা ঘুচিয়ে দেবেন বলে অনেকবারই দাবি করেছিলেন মোদি। অথচ নোট বাতিল ও অতিরিক্ত করারোপের ফলে জীবিকা হারিয়েছেন কয়েক লাখ মানুষ। রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) গভর্নর উর্জিত প্যাটেল ও ডেপুটি গভর্নর বিরল আচার্য ১০ ডিসেম্বর পদত্যাগ করলে ভারতীয় স্টক মার্কেটে ভয়াবহ পতন ঘটে। তিন ট্রিলিয়ন ডলারের ভারতীয় অর্থনীতির জন্য এই ব্যাংকটির ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রঘুরাম রাজনকে গভর্নরের দায়িত্বে বহাল রাখতে চাননি মোদি। দায়িত্ব দেয়া হয় প্যাটেলকে। তিনি মোদির নোট বাতিলের পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করাকে অনুমোদন করেছিলেন, যা রাজন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। সম্প্রতি মোদি যখন আরবিআইকে রিজার্ভের এক-তৃতীয়াংশ আলাদা করতে বললেন, তখন প্যাটেল তাতে সায় দেননি। ফলাফল- আবারও পদত্যাগ।
বিপর্যয়কর নোট বাতিলের সময় মোদি ধারণা করেছিলেন, ২০ থেকে ২৫ ভাগ নগদ অর্থও সিস্টেমে ফিরে আসবে না। কিন্তু প্রায় ৯৯ ভাগ নগদ অর্থ সিস্টেমে ফিরে এলে মোদির পপুলিস্ট প্রচারণা থমকে যায়। সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়া ইকোনমি (সিএমআইই) বলেছে, এজন্য জিডিপিতে ক্ষতি হয়েছে ১ দশমিক ৫০ শতাংশ। নোট বাতিল করা আর অর্থনীতিতে এর মারাত্মক প্রভাব এত বেশি ছিল যে রাম মন্দির নিয়ে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টির চেষ্টাতেও কাজ হয়নি। এমনকি হিন্দি বলয়েও এখন আর মন্দির-মসজিদ ইস্যু সাড়া জাগাচ্ছে না। মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড় ও রাজস্থানের মতো হিন্দি বেল্টের তিন রাজ্যের ফলাফল ভারতের জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলবে। ৫৪৩ আসনের লোকসভায় এ তিন রাজ্যের রয়েছে ৬৫ আসন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি এ তিন রাজ্য থেকে জয় পায় ৬১টি আসনে। সবশেষ জনমত জরিপ অনুযায়ী, ২০১৪ সালে হিন্দি বলয়ের ৯টি রাজ্যে বিজেপি ২৪৬টি আসনের মধ্যে ২২২টি পেলেও এবার যদি বিরোধী জোট নাও হয়, তবে বিজেপি পেতে পারে ১৭৮টি, আর জোট হলে পেতে পারে ১৪৪টি।

Disconnect