ফনেটিক ইউনিজয়
নির্বাচনী মওসুম ও উচ্ছ্বাসহীনতার তাৎপর্য
মনজুরুল হক

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এখন আর দোরগোড়ায় নয়, একেবারে নাকের ডগায়। বলা ভালো রাত পোহালেই নির্বাচন। অথচ নানাবিধ সংকটে বিনোদনবঞ্চিত সাধারণ মানুষ যে নির্বাচন ঘিরে নতুন ধরনের নির্বাচন-বিনোদন লাভ করে, এবার তাও নেই। এবারকার নির্বাচন নানা দিক থেকে অভিনব। ভিন্ন ভিন্ন কারণে অভূতপূর্ব এবং ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তারপরও এ রকম একটি নির্বাচনে যেরকম জনসাড়া  থাকার কথা, যেরকম উচ্ছ্বাস থাকার কথা, তা নেই। কেন নেই- তা কোটি টাকার প্রশ্ন।
আমাদের দেশে শাসকশ্রেণির অবস্থান থেকে বেশ ঘটা করে বলা হয়- নির্বাচন হলো জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার। একেবারে খোদাই করে তকমা দেয়া হয়- ভোট জনগণের মৌলিক অধিকার এবং পবিত্র আমানত। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে- ব্রিটিশ, পাকিস্তান আর বাংলাদেশের এই সাতচল্লিশ বছরে কখনও এই তকমা-বাণীর সার্থকতা মেলেনি। প্রতি পাঁচবছর পর পর জনগণ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়ে এসেছেন। কেউ কেউ সেটিও পারেননি। তারপরও তাদের বিশ্বাসের জায়গাগুলো একেবারে নড়বড়ে হয়ে ভেঙেচুরে পড়েনি। এবার পড়েছে। এবার সেই বিশ্বাসের জায়গাগুলো আর অটুট নেই। এবার সেই আস্থার জায়গা থেকে ‘পবিত্র আমানত’ শব্দগুচ্ছ কোথায় যেন মিলিয়ে গেছে। এর পেছনের কারণ কী? এর পেছনে কোনো একটি কারণ নয়, কারণ একাধিক।
এক. এবার বত্রিশ বছর পর দেশে কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে চলেছে। এই বত্রিশ বছর আগে সর্বশেষ নির্বাচন যেটা হয়েছিল সেটাও ছিল মহাবিতর্কিত। সেটা ১৯৮৬ সালের সেই ‘কুখ্যাত’ নির্বাচন। তারপর থেকে ২০০৮ পর্যন্ত সব জাতীয় নির্বাচনই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হয়েছে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাই বাতিল করে দেয়া হয়। ২০১৪ সালের বিতর্কিত একতরফা নির্বাচনকে সে অর্থে কোনো সাধারণ নির্বাচন বলা যাবে না। দেশ স্বাধীনের পর এবারই সাড়া জাগানো একটি নির্বাচন হতে চলেছে দলীয় সরকারের অধীনে। এই ‘দলীয় সরকার’ বা মহাজোট সরকারের গত দশ বছরের কর্মকা- পর্যালোচনায় দেখা যায়, তারা বিগত সময়গুলোতে বিরোধী দল এবং বিরোধী মতামতগুলোর উপর এত বেশি নিপীড়ন-নির্যাতন চালিয়েছে, যার রেশ ধরে জনসাধারণের ব্যাপক অংশ মনে মনে এ নিয়ে আতঙ্কিত যে, নির্বাচনে বা নির্বাচনের আগে কিংবা পরে কোনো বড় ধরনের ক্র্যাশ-আউট হতে পারে। এটাও নির্বাচন অনীহার একটি কারণ।
দুই. তফসিল ঘোষণা এবং মনোনয়নপত্র কেনা-জমার আগপর্যন্ত জনসাধারণের মনে এ রকমও আশঙ্কা ছিল যে, আদৌ নির্বাচন হবে না! বিএনপিসহ অপরাপর বিরোধী দলের দাবি ছিল তত্ত্বাবধায়ক বা কেয়ার টেকার সরকারের অধীনে ছাড়া নির্বাচনে যাবে না। সরকারের তরফে ছিল একগুয়ে মনোভাব- তারা কোনোভাবেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা  
তিন. ২০১৪ সালের নির্বাচনে কি হয়েছে, কিভাবে ক্ষমতাসীন দল বা জোট জয়ী হয়ে ফের পাঁচ বছরের শাসনকাল হাসিল করেছে- সেই ইতিহাস জনগণের মন থেকে সরে যায়নি। এত দ্রুত তা বিস্মৃত হওয়ার কথাও নয়। জনগণ দেখেছে কিভাবে ১৫৩ টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দি¦তায় সরকারি দল এককভাবে জয়ী হয়েছে! সেই নির্বাচনকে কোনোভাবেই নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু, বা অবাধ বলার সুযোগ নেই। এবার যদি বিএনপি এবং তার মিত্ররা গতবারের মতো ভোট বয়কট করে তাহলে আবারও সেই ২০১৪ সালের মতো ‘ওয়ান সাইডেড গেম’ হয়ে যাবে- এ শঙ্কাও জনসাধারণের মনে একেবারে গেড়ে রয়েছে। নির্বাচনের উৎসাহে ঘাটতি পড়ার সেটিও এক কারণ।
চার. নির্বাচন এলে কতগুলো কমন ফেনোমেনন এই দেশে, রাষ্ট্রে প্রায় নিয়মিত দেখা যায়। এবার সেটারও ব্যত্যয় ঘটেছে। নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয় এবং তারাই প্রশাসন ঢেলে সাজায়। দলীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দলীয় আচরণ থেকে সরে আসতে বাধ্য করা হয়। নির্বাচন কমিশন থেকে এবার সেরকম কোনো উদ্যোগই নিতে দেখা যায়নি। দেখা গেছে- অন্য সব দলের নির্বাচনী প্রচারাভিযান বন্ধ হয়েছে, কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের বা জোটের নির্বাচনী প্রচার চলছে পুরোদমে! নির্বাচন কমিশন যাকে ‘লেভেল প্লেইং ফিল্ড’ বলতে চাইছে, তা যে আদৌ লেভেল প্লেইং ফিল্ড নয়- তার প্রমাণ মেলে সরকারদলীয় সাধারণ সম্পাদকের কথাতেই।
তিনি বলেছেন, ‘যেখানে প্রয়োজন সরকার কিন্তু কখনো বলেনি সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হবে না। প্রয়োজন, পরিস্থিতি বলে দেবে কী করতে হবে। কিন্তু বিএনপি এখন সেনাবাহিনী, সেনাবাহিনী বলে চিৎকার করছে। তার মানে একটা উসকানি দিতে চাইছে। সেনাবাহিনীর সঙ্গে সরকারের একটা বিরোধ বাধানোর উসকানি দিচ্ছে। এটা কিন্তু দেশের জন্য ভালো নয়।’
বিএনপি’র উদ্দেশে তিনি আরো বলেন, ‘...সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হবে কিনা তা নির্বাচন কমিশন সরকারের সঙ্গে আলাপ করবে। নির্বাচন কমিশন ডিমান্ড দেবে। কারণ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নির্বাচনের সময় ইসির অধীনে গেলেও সেনাবাহিনী কিন্তু যাবে না। সেনাবাহিনী প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকবে। সেনাবাহিনী নিয়োগ করতে হলে সরকারকে ইসি অনুরোধ করতে হবে।
‘...আচরণবিধি পৃথিবীর সব গণতান্ত্রিক দেশেই আছে, বিশেষ করে যেসব দেশে আছে পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসি। যে কোনো নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী ক্যাম্পেইন করতে পারেন। ভারতে ত্রিপুরার বিধানসভা নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রচার চালিয়েছেন। তো আমাদের দেশে মন্ত্রী পারবেন না? সব দেশে যেটা হচ্ছে, আমাদের দেশে সেই সুযোগ কেন থাকবে না?’ (বাংলা ট্রিবিউন, ২০ এপ্রিল ২০১৮)।
এটা একজন নেতা বা একজন মন্ত্রীর ভাষ্য। এ রকম আরও মন্ত্রী বা নেতাদের ভাষ্য যোগ করলে যা দাঁড়ায়, তাতে করে ‘লেভেল প্লেইং ফিল্ড’ বলতে কোনো কিছু দৃশ্যমান হয় না। এটাই এবারের নির্বাচনে জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের অন্তরায়। এ কারণেই এবার সাধরণ মানুষ যেন ধরেই নিয়েছেন- ‘যা-ই ঘটুক, অন্য কেউ নির্বাচিত হওয়ার সম্ভবনা কম!’
পাঁচ. নব্বই সালে স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের স্বপ্ন বীজ রোপিত হয়েছিল। মানুষ ধরে নিয়েছিল- এত বড় একটা অভ্যুত্থানের পর দেশে এবার সত্যি সত্যি গণতন্ত্র আসবে। যথারীতি নির্বাচন হয়েছিল। নতুন গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হয়েছিল। একটা বিরোধী দল ছিল। তারা পাঁচবছর দেশ শাসন করেছিল। এরপর ধাপে ধাপে আরও সরকার এসেছে। তিন মাসের নাম করে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসেছে। তারা তিন মাসের বদলে দু’বছর থেকেছে। এই দু’বছরে তারা ‘র‌্যাডিক্যাল চেঞ্জ’-এর নামে সিস্টেমের খোল-নলচে বদলাতে চেয়ে শেষ মেষ কিছুই না বদলে শুধু দুই নেত্রীকে ‘টোকেন’ কারাবাস দিয়ে আলোচিত সমালোচিত হয়ে বিদায় নিয়েছে।
ক্ষমতায় বসেছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার। এরাও গণ্ডা গণ্ডা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কার্যত যার কোনোটিই শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। বরং দেশে প্রথমবারের মতো জঙ্গি হামলা হয়েছে। ধর্মের নামে মানুষ খুন করার নতুন ‘প্রথা’ চালু হয়েছে। ধর্মীয় এবং জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে ছাড় দিতে দিতে তারা এখন প্রায় আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়ার মতো ভূ-সামাজিক অবস্থানে পৌঁছে গেছে! এই সরকারের আমলেই জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে নির্বিঘ্নে লোপাট হয়েছে। সেই লোপাটের ঘটনায় সরকারের একাধিক দায়িত্বশীল মন্ত্রীদের নির্লিপ্ততা দেখে এটা মনে হওয়া অপরাধ হবে না যে, টাকা যারা লোপাট করেছে তারা কেউ ‘পর’ নয়! এ সরকারের আমলে জনগণের বাকস্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার, নাগরিক অধিকার এবং মানুষের ন্যূনতম জন্মগত অধিকারও সংকুচিত হয়েছে। ‘কুখ্যাত’ তথ্য নিরাপত্তা আইন জারি হয়েছে। সকল প্রকার প্রচারমাধ্যম কুক্ষিগত হয়েছে। সর্বোপরি সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ভূ-রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক- সবক্ষেত্রে মানুষের ন্যূনতম অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। লুণ্ঠিত হয়েছে।
এবার নির্বাচনে এসব ফ্যাক্টরগুলো জনসাধারণের মনে প্রতিক্রিয়া করেছে, করছে, করবেও। এর নিট ফলাফল হলো- এবারকার নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রচলিত নির্বাচন মওসুমের সেই আমেজ অনুপস্থিত থাকা। শেষ কথা হলো- জনসাধারণ যতই কম জানুন, যতই শাসকদের, প্রশাসনের ভেদ-মন্ত্র না বুঝুন, দিন শেষে তারা এটা বোঝেন- কিসে তাদের সম্মান আর কিসে অসম্মান।

Disconnect