ফনেটিক ইউনিজয়
নৌকার পালে হাওয়া কোণঠাসা ধানের শীষ
কাফি কামাল

দিন দশেক পরেই একাদশ জাতীয় নির্বাচন। দীর্ঘ একদশক পর বাংলাদেশে ফিরছে ভোটের উৎসব। জনগণ প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে আগামী পাঁচবছরের জন্য জাতীয় সংসদে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে যাচ্ছে আগামী ৩০ ডিসেম্বর। যারা সরকার গঠন ও দেশ পরিচালনা করবেন। নির্বাচন কমিশনের শিডিউল অনুযায়ী প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ ও আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হয়েছে দশদিন আগে। সে হিসেবে এখন ক্ষমতাসীন, বিরোধীদলীয় বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পক্ষে ভোটের প্রচারণায় মিছিলে-স্লোগানে মুখরিত থাকার কথা সারাদেশ। অলি-গলি, পাড়া-মহল্লা ছেয়ে যাওয়ার কথা প্রার্থীদের প্রতীক সংবলিত পোস্টারে। কিন্তু বাস্তবতা পুরোপুরি ভিন্ন। নৌকার পালে অনুকূল হাওয়া বইলেও কোণঠাসা ধানের শীষ।
রাজধানীসহ সারা দেশেই পাড়া-মহল্লায় গড়ে উঠেছে ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ক্যাম্প। পোস্টারে পোস্টারে সয়লাব সর্বত্র। অলি-গলি, পাড়া-মহল্লা চষে বেড়াচ্ছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও নৌকা মার্কার প্রচারকর্মীরা। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা মোটরসাইকেলে মহড়া দিচ্ছেন। টেলিভিশনে প্রচার হচ্ছে সরকারের উন্নয়নের গুণকীর্তনে তৈরি নির্বাচনী প্রচারণার বিজ্ঞাপন। কিছু বিজ্ঞাপনে বিএনপিসহ বিরোধী জোটের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো হচ্ছে কৌশলে। ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে প্রচারণায় নেমেছেন ক্রীড়াব্যক্তিত্ব, নায়ক-নায়িকা, কণ্ঠশিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা। সবমিলিয়ে একধরনের উৎসব উৎসব ভাব। তবে সেটা একপক্ষীয়।
ভোটের মাঠে প্রচারণার দ্বৈরথে নেই বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা। রাজধানী ঢাকায় রয়েছে ১৫টি নির্বাচনী আসন। এর কোনোটাতেই নির্বাচনী ক্যাম্প তৈরি করতে পারেনি ধানের শীষের প্রার্থীরা। সারা দেশের পরিস্থিতিও কমবেশি একইরকম। ক্ষমতাসীন দলের কর্মী-সমর্থকদের হামলা, হুমকি-ধমকি ও বাধা দেয়ার পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী, নেতাকর্মী, প্রচারকর্মীদের গ্রেফতার অব্যাহত রেখেছে পুলিশ। প্রচারণার প্রথম সপ্তাহে সারা দেশে গ্রেফতার হয়েছেন অন্তত ৭৫০ জন বিরোধী নেতাকর্মী ও সমর্থক। মামলা হয়েছে সহস্রাধিক নেতাকর্মীর নামে। সারা দেশে অব্যাহত রয়েছে পুলিশের গ্রেপ্তার অভিযান। বিশেষ করে প্রতিটি নির্বাচনী আসনে প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচন পরিচালনা করবেন এমন গুরুত্বপূর্ণ নেতা, কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করবেন এমন তৃণমূল নেতাদের তালিকা করে গ্রেফতারের অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। ধানের শীষের দুই প্রার্থী- গাজীপুর-৫ আসনের ফজলুল হক মিলন ও সাতক্ষীরা-৪ আসনের গাজী নজরুলকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া আগে গ্রেফতার হওয়া অন্তত ১০ প্রার্থীকে কারাগারে অবস্থান করেই নির্বাচনী লড়াইয়ে নামতে হবে। অন্তত ২০ জন প্রার্থীর স্বামী বা স্ত্রী, ছেলে, ভাই, নিকটাত্মীয় বা প্রধান নির্বাচন সমন্বয়ককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
হামলা হয়েছে প্রধান বিরোধী জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গাড়িবহরে। ১৪ ডিসেম্বর মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা অর্পণ শেষে ফেরার পথে হামলার শিকার হন ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন। নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন অন্তত ৫০ জন প্রার্থী। প্রচারণায় বাধার মুখে পড়েছেন ঐক্যফ্রন্টের দুই শীর্ষ নেতা আ স ম আবদুর রব ও মাহমুদুর রহমান মান্না। নির্বাচন প্রচারণার আনুষ্ঠানিক শুরুর পর প্রথম সাতদিনে দুই শতাধিক হামলা হয়েছে অন্তত ৪৫টি জেলায়। যদিও বিএনপি’র দাবি ৩০০ আসনেই ঘটেছে হামলা ও বাধা দেয়ার ঘটনা।
একাদশ নির্বাচনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে প্রচারণার মাঠে শীর্ষ দুই নেত্রীর অনুপস্থিতি। প্রতিটি নির্বাচনের আগেই সারা দেশে বিভাগীয় পর্যায়ে তারা প্রচারাভিযানে যান। এবার বিএনপি নেত্রী কারাগারে বন্দি। প্রধানমন্ত্রী এখন পর্যন্ত কোনো প্রচারাভিযানে যাননি। তবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা সংক্ষিপ্ত পরিসরে সিলেট ও ময়মনসিংহে প্রচারাভিযান চালিয়েছেন। যদিও তাতে দুই নেত্রীর মতো সাড়া পড়েনি। গণসংযোগ, মাইকিং, মিছিল, পোস্টার টানানোর ক্ষেত্রে কোণঠাসা হলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণায় সরব জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী, নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। প্রার্থীরা ভোটের গান, ভোট চেয়ে বানানো বিজ্ঞাপন, সরকারের সমালোচনা করে তৈরি ভিডিও ক্লিপিং, ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের বিভিন্ন বিতর্কিত ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য প্রচার করে ভোটারদের বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তবে বিএনপি’র প্রচারণায় সবচেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে খালেদা জিয়ার কারামুক্তির বিষয়টি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের তরফেও খোলা হয়েছে প্রচারণায় ফেসবুক পেজ। কোনো কোনো প্রার্থী প্রায় প্রতিদিনই ভিডিও বার্তার মাধ্যমে ভোটারদের সঙ্গে সংযোগ ঘটানোর চেষ্টা করছেন।
সারা দেশে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীরা কেমন প্রচারণা চালাচ্ছেন বা চালাতে পারছেন তা বুঝতে কয়েকটি ঘটনাই যথেষ্ট। গণসংযোগ করতে গিয়ে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সংঘর্ষ ও পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছেন ধানের শীষের দুই প্রার্থী নোয়াখালী-১ আসনের ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন ও সিরাজগঞ্জ-২ আসনের রুমানা মাহমুদ। হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটছে কক্সবাজার-১ আসনের প্রার্থী হাসিনা আহমেদ ও নাটোর-২ আসনের প্রার্থী সাবিনা ইয়াসমিন ছবির ওপর। ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের হামলার মুখে পড়েছেন- বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ড. আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চৌধুরী তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম, এডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, আফরোজা আব্বাস, জয়নুল আবদিন ফারুক, কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রমের ছেলে ওমর ফারুক ও গোলাম মওলা রনির স্ত্রীসহ অনেকেই। মহাজোট সরকারের টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ছিলেন আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। মন্ত্রিত্ব হারানোর পর কারাভোগ করেছেন। দল থেকে বহিষ্কার এ নেতা এবার টাঙ্গাইল-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। নির্বাচনী প্রচারণার সময় তার গাড়িবহরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার বিচার চেয়ে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার অফিসের সামনে চাটাই বিছিয়ে শুয়েছিলেন সারাদিন। ঢাকা-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমা ইসলামের স্বামী ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম বাবুল সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে অভিযোগ করেছেনÑ নেতাকর্মীদের নামের তালিকা করে অযথা হয়রানি করছে পুলিশ। বাড়ি বাড়ি তল্লাশি, পোস্টার-ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা ও প্রচারে বাধা দেয়ার অভিযোগও করা হয়। পুলিশি নিরাপত্তার নামে নিজ বাড়িতে গৃহবন্দি আছেন বলে অভিযোগ করেছেন চাঁদপুর-২ নির্বাচনী আসনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী ড. জালাল উদ্দিন। জাতীয় পার্টি মহাজোটের শরিক দল হলেও হামলা হয়েছে মানিকগঞ্জ-২ আসনে জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী এসএম আবদুল মান্নানের প্রচারণায়। পুলিশের লাঠিচার্জে পা ভেঙেছে কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের বিএনপি প্রার্থী শরিফুল আলমের।
নির্বাচনে প্রচারণার একটি উপায় ব্যানার পোস্টার টাঙানো। কিন্তু সে প্রচারণাও হয়ে পড়েছে ভারসাম্যহীন। সারা দেশেই মহাসড়ক থেকে অলিগলি সবখানেই ঝুলছে ক্ষমতাসীন জোটের প্রার্থীদের ব্যানার-পোস্টার। বেশির ভাগ জায়গায় বিশেষ করে রাজধানীসহ মহানগরগুলোতে চোখে পড়ে না জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থীদের পোস্টার। তবে কোথাও কোথাও চোখে পড়ে বামজোট বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কিছু পোস্টার।
অভিযোগ উঠেছে, ব্যানার-পোস্টার টানাতে গেলেই বিরোধী কর্মী-সমর্থকদের হামলা করছে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা। আবার কোথাও কোথাও পোস্টার সাঁটানোর সময় গ্রেফতার করা হচ্ছে। কৌশলগত কারণে কোথাও কোথাও এ কাজটি করছেন দলটির নারী কর্মী-সমর্থকরা। রাজশাহীতে গভীর রাতে মই দিয়ে নারীদের ধানের শীষের পোস্টার ঝুলানোর একটি ছবি ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। কেবল পোস্টার টানানোতে বাধাগ্রস্তই হচ্ছে না, প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হচ্ছে ধানের শীষের প্রার্থীদের পোস্টার ছাপানোর ক্ষেত্রে।
জাতীয় নির্বাচনের আগে এমন ঘটনাকে নজিরবিহীন বলছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে এর আগে এমন পরিস্থিতি দেখা যায়নি। এটাকে নজিরবিহীন বলা যায়। নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে সংঘাত ও হামলার ঘটনায় সার্বিক পরিস্থিতির এতটাই অবনতি হয়েছে যে, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, পরিস্থিতি ‘নো ইলেকশনের’ দিকে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্নস্থানে হামলা, সহিংসতার ঘটনায় নির্বাচন কমিশন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ বলে মনে করছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
নির্বাচনের দিন যতই এগিয়ে আসছে ততই বাড়ছে আতঙ্ক-উদ্বেগ। রাজনৈতিক মহল, সুশাসন ও আইন নিয়ে তৎপর সংগঠনগুলো নির্বাচন নিয়েই শঙ্কা প্রকাশ করছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘নিজেদের বিবেককে জিজ্ঞাসা করুন, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আছে কি না, তাহলে উত্তর পেয়ে যাবেন। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কথাটিই এখন পর্যবসিত হয়েছে অর্থহীন কথায়।’
তবে নির্বাচনের আগের শেষ সপ্তাহে সেনাবাহিনী মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। তখন পরিস্থিতির কিছুটা হলেও উন্নতি হবে। সে সময় সুনির্দিষ্টভাবে ক্যাম্পেইন চালাবে ধানের শীষের প্রার্থী ও ঐক্যফ্রন্টের নেতাকর্মীরা। চট্টগ্রাম জেলার প্রার্থীদের একমঞ্চে বসে সংবাদ সম্মেলন ও প্রার্থী পরিচয়ের ঘটনাকে মডেল ধরে নানা জেলার প্রার্থীরা ঐক্যবদ্ধ প্রচারণা চালাবেন বলে জানা গেছে।

Disconnect