ফনেটিক ইউনিজয়
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন
প্রশ্নবিদ্ধ ইসি
হামিদ সরকার

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পদক্ষেপ নিয়ে নানা প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। তফসিল পরবর্তী ইসির সামগ্রিক আচরণ ও কার্যক্রমে এই প্রশ্নের ভিত আরও মজবুত হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও পদক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন নিয়ে সৃষ্টি হচ্ছে নানা রকম বিতর্ক। সম্প্রতি সিইসি কেএম নূরুল হুদা বলেছেন, ‘নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আছে বলেই সবাই প্রচারণা চালাতে পারছেন।’ কিন্তু এর সঙ্গে একমত হতে পারছেন না কমিশনের জ্যেষ্ঠ কমিশনার মাহবুব তালুকদার। তার মতে, ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলে কিছু আছে বলে মোটেই মনে করি না। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কথাটা এখন একটা অর্থহীন কথায় পর্যবসিত হয়েছে।’
অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে সব পক্ষের জন্য সমান সুযোগ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড সৃষ্টির বিষয়টি আজও নিশ্চিত করতে পারেনি। প্রতিদিনই বিভিন্ন আসনে সংঘর্ষ হচ্ছে। সরকারি দল ও তাদের জোটভুক্ত দলের প্রার্থীদেরই পোস্টার-ব্যানার নির্বাচনী মাঠে শোভা পাচ্ছে। এ ব্যাপারে দলগুলোর পক্ষ থেকে দফায় দফায় লিখিতভাবে অভিযোগ ও দাবি জানালেও ইসি’র পক্ষ থেকে আশ্বাসের বাণী ছাড়া দৃশ্যমান কোনো বাস্তব পদক্ষেপ নেই।
এর আগে দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেয়ার সময়ও দেখা গেল নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত ভূমিকা। আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র কিনতে দলে দলে মানুষ ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে ধানমন্ডি গেল। পুরো রাজধানীতেই দেখা গেল তীব্র যানজট। অথচ নির্বাচন কমিশন আচরণবিধি লঙ্ঘনের কিছু খুঁজে পেলো না। কিন্তু বিএনপি মনোনয়নপত্র বিক্রির সাথে সাথে কমিশন আচরণ বিধি লঙ্ঘনের প্রচার শুরু করল। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নির্বাচন কমিশনের এ রকম ভূমিকাই নয়াপল্টনে বিএনপি’র কার্যালয়ের সামনে ভাঙচুর জ্বালাও-পোড়াওয়ে ইন্ধন দিয়েছে। দু’চোখে দু’ধরনের দৃষ্টি ইসিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
উল্লেখ্য, শুরু থেকেই ইসি’র পদক্ষেপগুলো নিয়ে প্রশ্নের দানা বাঁধে। সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করেই নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার কথা। কিন্তু দেখা গেল হঠাৎ করেই সিইসি ৮ নভেম্বর তফসিল ঘোষণা করলেন। এর পর যখন রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে নির্বাচন পেছানোর দাবি করা হলো, তখন তিনি আবার রাজনৈতিক দলগুলো সঙ্গে পরামর্শ, এমনকি নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা না করে একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে বক্তৃতার মাঝে তফসিল পরিবর্তনের ঘোষণা দিলেন। ইসি’র অনেক সিদ্ধান্তই কমিশনের সবার সঙ্গে আলোচনায় হয়নি।
আবার পুনঃতফসিল ঘোষণার পর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা যখন নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে বৈঠক করলেন, তখন নির্বাচন পেছানোর ব্যাপারে আবার আশ্বাস দিলেন সিইসি। এর আগে নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে ইভিএম কেনা নিয়েও সিইসি বিতর্কের মুখে পড়েন। আপত্তি সত্ত্বেও ইসি তড়িঘড়ি করে কেন ছয়টি আসনে ইভিএম ব্যবহার করতে চাইছে- সেটাও এক প্রশ্ন।
আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে হামলা ও সহিংসতা প্রতিরোধে ইসি ‘ব্যর্থ’ বলে মনে করছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। সম্প্রতি এক বিবৃতিতে এ কথা জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। তাদের মতে, ১০ ডিসেম্বর থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু বহাল করবে না। নির্বাচন হলে দলীয় সরকারের অধীনেই হবে। এবং এটাই হতে হবে। এই একগুয়ে মনোভাব বিরোধী দলগুলো মেনে নেবে, নাকি নির্বাচন বয়কট করবে? সেই দ্বিধা-দ্বন্দে¦ জনসাধারণের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে প্রাথমিক ঔৎসুক্য দেখা যায়নি। জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণও এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।    
হওয়ার পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনের প্রচার চালানোর সময় হামলা, বাধা, সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে হামলার শিকার হচ্ছেন একটি বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সদস্যরা। কিন্তু এসব ঘটনায় নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। হামলা ও সহিংসতা প্রতিরোধ কিংবা জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে কমিশনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ।
সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে জোর দাবি জানায় আসক। তারা আরো বলছেন, নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে হামলা ও সহিংসতা বাড়ায় জনমনে আশঙ্কা ও উৎকণ্ঠা তৈরি হচ্ছে। জাতিকে একটি শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন এবং প্রদত্ত সাংবিধানিক দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালনের জন্য কমিশনকে দ্রুততার সঙ্গে এসব সহিংসতা বন্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে। সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে, সর্বোপরি জনগণ যাতে সম্পূর্ণভাবে শঙ্কামুক্ত থেকে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম. হাফিজউদ্দিন খানের মতে, ‘আস্থার সংকট এখনো কাটেনি। নির্বাচনী উত্তাপ রয়েছে। চারদিকে সংঘর্ষ, মানুষ মারা যাচ্ছে। প্রতিপক্ষের উপর হামলা করা হচ্ছে। তাদেরকে প্রচারণা চালাতে দেয়া হচ্ছে না। প্রতিদিনই আমরা দেখছি ঐক্যফ্রন্ট ও অন্যান্য দল এসবের প্রতিকারে ইসি’র হস্তক্ষেপ চেয়ে চিঠি দিচ্ছে। কিন্তু ইসি নীরব ভূমিকা পালন করছে। কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখছি না। নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারবে কিনা, তা নিয়ে তার অবস্থান স্পষ্ট করতে পারেনি। সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে সংশয়ের পরিমাণ আরো বাড়ছে। পুলিশসহ প্রশাসন তাদের কথা শুনছে না।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে হবে ইসিকে। এটা করতে ব্যর্থ হলে, তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। ইসি ক্ষমতাসীন দলকে বেশি সুবিধা দিচ্ছে বলে দৃশ্যমান হলে নিশ্চিতভাবেই ভোটারদের আস্থা কমে যাবে। ফলে কমিশনের অবস্থান নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠাটাই স্বাভাবিক।

Disconnect