ফনেটিক ইউনিজয়
বৈধতার প্রশ্নে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন

নির্বাচন নিয়ে কোনো কোনো সুশীল মহল নৈতিক বৈধতার প্রশ্ন তুলেছেন। এ প্রশ্নে আমার একটু আপত্তি আছে। আপত্তিটা বৈধতার প্রশ্ন তোলার কারণে নয়। আপত্তি, বৈধতার সাথে ‘নৈতিক’ শব্দ যোগ করার কারণে। নির্বাচনে ‘নৈতিক বৈধতা’র প্রশ্ন তুললে আরো অনেক বিষয় এসে পড়ে।  ২০১৪ সালে ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে যখন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসে, তখন নির্বাচন ও ক্ষমতা দু’টি নিয়েই নৈতিক বৈধতার প্রশ্ন উঠেছিল। প্রশ্নটা যখন খুব জোরেশোরে বিভিন্ন মিডিয়ায় উঠে আসে, দেশি-বিদেশি সকল মহলেও এ বিষয়ে স্পর্শকাতর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। তখন চাপের মুখে সরকার নিমরাজি হয়ে স্বীকার করে- ভোটারবিহীন,  প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায় আসা নৈতিকভাবে বৈধ না হলেও সাংবিধানিকভাবে বৈধ হয়েছে।  
নৈতিকতার সঙ্গে সংবিধানের এই সাংঘর্ষিকতার কারণ ছিল অনৈতিকভাবে সংবিধান সংশোধন। এই গুরুতর বিষয়টি প্রায় সকল মহল বুঝলেও, ক্ষমতাসীন সরকার কোনো রকমেই তা স্বীকার করতে চাইলো না। তবে খুবই ক্ষীণকণ্ঠে তারা সেদিন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতাকে শুধু সাংবিধানিকভাবেই নয়, নৈতিকভাবেও বৈধ করার জন্য প্রতিশ্রুতিবাণী শুনিয়েছেন। তারা বলেছিলেনÑ সংবিধান রক্ষার স্বার্থে ক্ষমতায় বসলেও, একবছরের মধ্যেই তারা নতুন নির্বাচন  দেবেন।  
হয়তো বা নৈতিকতার তাড়নায়-ই-তাঁরা এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি পালন করতে পারেননি। তারপর যা হয়েছে সেটা আমরা সবাই জানি। ক্ষমতার লিপ্সা অথবা দাপটের জোরে নৈতিক বৈধতার প্রশ্ন দু’-পায়ে মাড়িয়ে তাঁরা পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকলেন।
দুই,
তারপরও কি এই খেলার শেষ আছে? মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তাঁরা সংসদ ভেঙে না দিয়ে নির্বাচনের সময়েও বহাল তবিয়তে ক্ষমতায় থেকে নৈতিক বৈধতাকে আবারও দু’পায়ে মাড়ালেন।  
এখন অবস্থা হয়েছে এ রকম যে, ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা ও পেশীশক্তির দাপটে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের গণআকাক্সক্ষা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ার প্রান্তে। ক্ষমতাসীন দল রীতিমতো আটঘাট বেঁধে, কোমর কেচে এমনভাবে নির্বাচনের মাঠে নেমেছেন যে-তাদের কাছে আজব দেশ ও জনগণ অসহায়, সিভিল ও পুলিশ প্রশাসন অসহায়, নির্বাচন পরিচালনার সর্বময় ক্ষমতাধারী নির্বাচন কমিশনও অসহায়, এমনকি ধামাধরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারও বলছেন তিনি ‘বিব্রত’।
আমাদের জাতীয় নির্বাচনের ‘চমৎকার’ বাস্তব অবস্থা এখন এই যে- ‘নৈতিক বৈধতার’ প্রশ্ন এখন হায় হোসেন, হায় হাসান বলে মাথা কুটে মরছে। এরপর আবারও হয়তো আমাদের সেই পুরনো ‘অমৃতবাণী’ শোনার জন্য এবং মাথা নত করে সবকিছু মেনে নেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। হয়তো আবারও শুনতে হবে ব্যাপারখানা নৈতিকভাবে বৈধ না হলেও সাংবিধানিকভাবে বৈধ। হায়! সেলুকাস, হায়!  শামসুর রাহমান! ‘উদ্ভট উটের পিঠে’ চড়ে হাঁটা কী বিচিত্র এই দেশ!

Disconnect