ফনেটিক ইউনিজয়
দলিত কমল ও কলি

বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে জয়া আহসান নির্মিত ‘দেবী’ ছবিটি সাম্প্রতিককালে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। হুমায়ূন আহমেদের একনিষ্ঠ পাঠককূল তো বটেই, চিত্রমোদী কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী এবং গৃহিণীদের মধ্যেও জমে উঠেছে ছবি নিয়ে গভীর আগ্রহ ও কৌতূহল। যা সঞ্চারিত হচ্ছে এক থেকে অনেকে। মনস্তাত্ত্বিক ও অতিপ্রাকৃত বিষয় ছবি বা গল্পটির মূল বলেই কি মানুষের মনে এত আগ্রহ? না। ছবিটির প্রতি মানুষের আগ্রহ ও কৌতূহলের কারণ ঔপন্যাসিক ও সফল নাট্যনির্মাতা হিসেবে হুমায়ূন আহমেদের আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা ও উপন্যাসের বিশেষ চরিত্র ‘মিসির আলীর’ প্রথমবারের মতো চলচ্চিত্রে আবির্ভাব। ‘দেবী’ একটি আতঙ্ক সৃষ্টিকারী ছবি, যাকে আমরা Horror Film বলে থাকি। তবে ছবির যে বিষয়টি কম আলোচিত হচ্ছে তা হলো শ্লীলতাহানি বা ধর্ষণ। একটি মেয়ের জীবনে শ্লীলতাহানি বা ধর্ষণের ভয়াবহতা ভুক্তভোগী এবং তার পরিবার তিলে তিলে টের পায়। হুমায়ূন আহমেদের ‘দেবী’ ছবির এই অংশটি ছবির পর্যালোচনায় তেমন গুরুত্ব দিয়ে উঠে আসছে না। দেবী প্রশংসিত হয়েছে আমাদের দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের গতানুগতিক প্রেম, রোমান্স, ধনী-গরিব বৈষম্য ইত্যাদি গল্পনির্ভর চলচ্চিত্রের ধারা থেকে সরে এসেছে বলে। ছবিতে প্রাধান্য পেয়েছে জয়া বা রানুর অতীন্দ্রিয় শক্তি এবং ভৌতিকতা বা Horror। এ দু’টোই এদেশের চলচ্চিত্রে একেবারে নতুন। আর উপেক্ষিত হয়েছে শিশু বয়সে ধর্ষণের ফলে জয়া বা রানুর মনস্তাত্ত্বিক দিকটি।
কোনো শিশু শৈশবে যৌন নিপীড়ন বা নির্যাতনের শিকার হলে সেই ঘটনা সে ভোলে না। এটি তার চিন্তা ও অবচেতনে প্রভাব ফেলে। এমন ঘটনায় নাবালিকা মেয়েদের অনেক সময়ই মনোবৈকল্য দেখা দেয়। ‘দেবী’ ছবিতে সামাজিক এই সমস্যাটি এমন একটা সময়ে উপস্থাপিত হয়েছে, যখন পত্রপত্রিকা, টেলিভিশন, চায়ের টেবিলের আড্ডা বা মেয়েদের সমাবেশে বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়াতেও এটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। মানুষের, বিশেষ করে মেয়েদের মনে সৃষ্টি হয়েছে গভীর উদ্বেগ, উষ্মা এবং ভয়। কারণ, বাঁচার তাগিদে মেয়েরা এখন নানা পেশায় চার দেয়ালের বাইরে চলে এসেছে। এমন কোনো পেশা নেই, যেখানে মেয়েরা অনুপস্থিত। তবে আমাদের শৈশবকালে বা যখন পড়াশুনা শেষ করে টেলিভিশনের চাকরিতে ঢুকেছি সেই আশির দশকে, ধর্ষণ বিষয়ে সংবাদ খুব কমই আসতো। এলেও আমরা খুব লজ্জিত হয়ে সংক্ষেপে সংবাদটা প্রচার করতাম। তবে কখনোই ‘ধর্ষণ’ শব্দটা লিখতাম না। লেখা হতো ‘শ্লীলতাহানি’। আমার স্পষ্ট মনে আছে ’৮০ থেকে ’৯০ এর দশকের শেষ পর্যন্ত কদাচিৎ এ ধরনের খবর প্রচারিত হয়েছে। যতদূর মনে পড়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ধর্ষণের সেঞ্চুরি’ শব্দটি উচ্চারিত হওয়ার আগে-পরে সময় থেকে এই ধরনের ঘটনা মানুষের মুখে, পত্রিকায় বিশেষভাবে স্থান পেতে থাকে। ইদানীংকালে নারীবাদী সংগঠনগুলোও এ ব্যাপারে সোচ্চার হয়েছে। নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, অধিকার, ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার, মহিলা পরিষদ, ন্যাশনাল ল’ইয়ার্স এসোসিয়েশনসহ নানা সংগঠন। সর্বশেষ যে আন্দোলন শুরু হয়েছে মেয়েদের প্রতি যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সেটা হলো #Me too মুভমেন্ট।
এক দশক আগে নিউ ইয়র্কের তারানা বুরকে নামে এক আফ্রোআমেরিকান মানবাধিকার কর্মী #Me too আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। তারানা নিজেই যৌন নিপীড়ন থেকে ত্রাণ পাওয়া ভাগ্যবতী। তিনি বলেছেন- তার ছয় বছর বয়সে প্রথম যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন। এক প্রতিবেশী টিনেজারের কাছে উপুর্যপরি কয়েকবছর যৌন নিপীড়িত হয়েছিলেন তিনি। পরবর্তীতে পথেঘাটে বহুবার ছেলে বা পুরুষদের দ্বারা উত্ত্যক্ত, নিগৃহীত হয়েছিলেন। এসব তিক্ত অভিজ্ঞতা তাকে সাহস যুগিয়েছিলো এ আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করতে। তারানা বলেন- “সহিংসা তো সহিংসতাই। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে আঘাত পাওয়ার যন্ত্রণা তো যন্ত্রণাই। অথচ আমাদের শেখানো হয়েছে বিষয়টা তুচ্ছভাবে দেখতে, যেন এটা একটা ‘ছেলেখেলা’।”
যদিও কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েদের সাহায্য-সহযোগিতার জন্য এই আন্দোলন শুরু হয়েছিলো, তবে প্রান্তিক মেয়েদের সহযোগিতার জন্য এ আন্দোলন হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। আর এ আন্দোলন মূলত ছড়িয়ে পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। যার মূল লক্ষ্য যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন থেকে মেয়েদের বাঁচিয়ে তোলা। আন্দোলন জোরদার করতে এগিয়ে এসেছিলেন মুভি স্টার অ্যাশলে জুড, অ্যালিসা মিলানো, রোজ ম্যাকগোয়ান, গীতিকার টেইলর সুইফটসহ আরও অসংখ্য নারী। যারা যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের তীব্র যন্ত্রণাকে আড়াল করাকে একসময় স্বস্তিদায়ক মনে করতেন। ২০১৭ সালে এঁদের সবাইকে ‘দি টাইম’ ম্যাগাজিন ‘নীরবতা ভঙ্গকারী’ বা সাইলেন্স ব্রেকার উপাধি দেয়। #মিটু আন্দোলন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া সত্ত্বেও তারানা খুব একটা সন্তুষ্ট নন। কেননা তার বক্তব্য, যদিও সোশ্যাল মিডিয়ার পাতা ভরে গেছে যৌন সহিংসতার কুৎসিত কাহিনীতে, তবু তাতে তো এই সমস্যার সমাধান আসেনি। যেসব মেয়ে তাদের গোপন যন্ত্রণার কাহিনী লিখেছেন, তাদের এবং যারা এই কাহিনী পড়ছেন, কারোরই এসব সমস্যা থেকে মুক্তি মেলেনি। যখন একটা বিষয় আলোচনা ও নিন্দার ঝড় তোলে, সে বিষয়টার  প্রতিকার হওয়া উচিত। শাস্তিভোগকারী মেয়েদের পাশে দাঁড়িয়ে, তারা যেভাবে চায় সমস্যার সমাধান করা দরকার। গোপন কাহিনী উন্মুক্ত করার সথে সাথে সেই কাহিনীর যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়, নিপীড়নকারীর উপযুক্ত শাস্তি হয়, যে কোনো বয়সের মেয়েরা নিরাপদে, স্বস্তিতে, নির্ভয়ে চলাফেরা করতে পারে সে পদক্ষেপ নেয়া। শঙ্কার কথা এই যে, বিভিন্ন মেয়েদের কাহিনীগুলো যেমন ভয়াবহ, লজ্জার তেমনি কখনো কখনে সেগুলো রগরগে। তাই না জানি মানুষ এই কাহিনীগুলো পড়তে গিয়ে রঙ্গরসে, কৌতূহলে, আসক্তিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে নিজেদের দায়দায়িত্বের কথা ভুলে যায়।
বাংলাদেশে নারীদের বর্তমান অবস্থার চিত্রটা ভালো কিছু নয়। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম এক সমীক্ষায় বলেছেÑ ২০১২ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত দেশে ১৩০১ জন শিশু ধর্ষিত হয়েছে। এদের মধ্যে পালাক্রমে ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, ধর্ষিতার আত্মহত্যা ইত্যাদি ঘটনাও রয়েছে। এই সংখ্যা সম্ভবত: আরও বেশি হবে। কেননা এর সাথে যোগ হবে ২০১৭ থেকে ২০১৮-তে সংঘটিত ঘটনা। তাছাড়া, সামাজিক ভয় ও কলঙ্ক এবং পরবর্তীকালে ধর্ষণকারীদের কাছে আরও হয়রানি ও নিপীড়ন থেকে বাঁচবার জন্য প্রকৃত সংখ্যা বা তথ্য অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। ধর্ষিতাদের মধ্যে শিশু, কিশোরী, তরুণী, বয়স্কা নারীরাও রয়েছেন। অনেক সময় পারিবারিক দ্বন্দ্ব-কলহ, জমি সংক্রান্ত বিরোধসহ আরও নানা কারণে এইসব অপ্রীতিকর ও ঘৃণ্য কর্মকা- ঘটে থাকে। সমীক্ষা বলছে- এ ধরনের বেশির ভাগ ঘটনাই নিকটাত্মীয়, পাড়া-প্রতিবেশী,  স্কুল-কলেজ ও ইউনিভার্সিটি শিক্ষক এবং পারিবারিক বন্ধুবান্ধবদের দ্বারা ঘটে থাকে। এরই সাথে এখন যোগ হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার অসংখ্য বন্ধু (যদিও এদের মধ্যে ভালো-মন্দ উভয়ই আছে)। আমাদের সামাজিক প্রবণতা হলো শুদ্ধিবাদের মুখোশ পরে থাকা। অর্থাৎ যে ঘটনাগুলো ঘটছে তা আড়াল করা। অবশ্য #মিটু আন্দোলনের মাধ্যমে এই প্রবণতা ভেঙে দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দেশ-বিদেশ, কালো সাদা এবং সব ভাষাভাষী মেয়েরাই এখন মুখ খুলতে শুরু করেছেন। কিন্তু সামাজিক এই ব্যাধি যেভাবে সংক্রমিত হচ্ছে ও বেড়ে চলেছে তাতে এর সমাধানের পথও দ্রুত বের করা জরুরি। বেশির ভাগ অপরাধী শেষতক দেখা যাচ্ছে ছাড়া পেয়ে যায়। খুব অল্পসংখ্যক অপরাধী দোষী বলে সাব্যস্ত হয় বা সাজা পায়। বিচারের দীর্ঘসূত্রিতাও অপরাধ কমিয়ে আনা এবং অপরাধ চিরতরে বন্ধের ব্যাপারে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। আবার বিচার কাজ অসংখ্যবার মুলতবি হওয়ায় অপরাধী পার পেয়ে যায় এবং তারা আত্মবিশ্বাস পায় পুনরায় একই অপরাধ সংঘটনের। কথায় আছে ‘বিচার বিলম্বিত করা মানেই বিচার অগ্রাহ্য করা’।
তাই এই জঘন্য ও বর্বরতম অপরাধ দমনে রাষ্ট্রের একটা বিরাট ভূমিকা আছে। আমাদের বর্তমান ধর্ষণ আইন ধর্ষিতাদের পক্ষে খুব একটা সহায়ক নয়। এসব অপরাধ দমন ও চিরতরে নিশ্চিহ্ন করতে রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ও আইন সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। আমি একান্তভাবে বিশ্বাস করি, ধর্ষণসহ সামাজিক নানা অপরাধরোধে রাষ্ট্র এবং আইন সংস্কারের সাথে পরিবার ও সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়দায়িত্ব আছে। ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা, সহজ-সরল জীবনভঙ্গি এবং মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ আমাদের এই কঠিনতম অপরাধ কমিয়ে আনতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

Disconnect