ফনেটিক ইউনিজয়
সাত সাগরের ওপারে মাহমুদুন্নবী
মান্নাফ সৈকত

‘তুমি কখন এসে দাঁড়িয়ে আছো’, ‘আমি সাত সাগর পাড়ি দিয়ে’,‘বড় একা একা লাগে’, ‘তুমি যে আমার কবিতা’, ‘ও মেয়ের নাম দেবো কী ভাবি শুধু তাই’, ‘গানের খাতায় স্বরলিপি লিখে’সহ অজস্র জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা তিনি। তাঁকে বলা হয় বাংলা সংগীতের আকাশে এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। তাঁর গাওয়া গান ১৯৬০ সাল থেকে শুরু করে এখনও শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রেখেছে। তিনি কিংবদন্তি মাহমুদুন্নবী। ২০ ডিসেম্বর এ গুণী শিল্পীর ২৮তম মৃত্যুবার্ষিকী।
শিল্পী মাহমুদুন্নবীর জন্ম ১৬ ডিসেম্বর ১৯৩৬ সালে বর্ধমানে। দেশ বিভাগের পর বাবা বজলুল করিমের চাকরির সুবাদে চলে আসেন বাংলাদেশে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের কার্জন হলে এক অনুষ্ঠানে তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হন বিখ্যাত গণসংগীত শিল্পী শেখ লুৎফর রহমান। তাঁর মাধ্যমেই করাচি রেডিও-তে প্রথম গান গাওয়ার সুযোগ হয় মাহমুদুন্নবীর। সেখানে প্রথম গান করেন ‘জিনেভি দো’ ছবিতে। এরপর গান গেয়েছেন ‘পিয়াসা’ ও ‘উলঝান’ ছবিতে। বাংলায় গান করার তাগিদে ১৯৬০ সালে ঢাকায় ফিরে রেডিওতে প্রথম নিজের লেখা ও সুর করা গান গেয়েছেন তিনি। মাহমুদুন্নবী বাংলা চলচ্চিত্রে প্রথম প্লেব্যাক করেন ১৯৬৬ সালে জহির রায়হান পরিচালিত ‘বেহুলা’ চলচ্চিত্রে। ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুথান ও ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস বাড়াতে অনেক গণজাগরণমূলক গান লিখে ও সুর করেছেন তিনি।
‘নাচের পুতুল’, ‘স্বরলিপি’,‘আয়না ও অবশিষ্ট’, ‘বেহুলা’, ‘আবির্ভাব’, ‘কাগজের  নৌকা’, ‘দর্পচূর্ণ’, ‘ছন্দ হারিয়ে গেল’, ‘আলো তুমি আলেয়া’, ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘অনির্বাণ’, ‘মধুমিতা’, ‘হারজিৎ’সহ অসংখ্য চলচ্চিত্রের গানে তাঁর কণ্ঠ সমৃদ্ধ করেছে সংগীতাঙ্গনকে। ১৯৭৬ সালে ‘দ্য রেইন’ চলচ্চিত্রে ‘আমি তো আজ ভুলে গেছি সবই’ গানটির জন্য সেরা প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন মাহমুদুন্নবী। একসময় তিনি আধুনিক সংগীত নিকেতন নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। পারিবারিকভাবে তিন মেয়ে ও এক ছেলের জনক তিনি। দুই মেয়ে  দেশের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী ফাহমিদা নবী ও  সামিনা চৌধুরী। ছেলে পঞ্চমও এক সময় ব্যান্ডসংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৯০ সালের ২০ ডিসেম্বর আধুনিক বাংলা গানের উজ্জ্বলতম এ নক্ষত্র মাত্র ৫৪ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চলে যান না ফেরার দেশে। কিংবদন্তি মাহমুদুন্নবীকে বাংলার কোটি কোটি দর্শক-শ্রোতা স্মরণ করেন গভীর সম্মান, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায়।
বাবাকে স্মরণ করে ফাহমিদা নবী বলেন, ‘খুব ভালো লাগে, যখন টের পাই, শ্রোতারা আমাদের মধ্যে বাবাকে খুঁজে পান। এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এ যে কত বড় পাওয়া একজন শিল্পীর জন্য। পাশাপাশি কত বড় দায়িত্ব সেটা বুঝতে পারি। কারণ বাবা যেভাবে কণ্ঠের আবেগকে মানুষের সামনে তুলে ধরতেন, তাতে শ্রোতারা তাঁর সুখ অথবা দুঃখের অনুভূতিতে মিশে যেতেন, যার কারণে তিনি এতটা প্রিয় মানুষ হয়ে উঠেছিলেন সেই ষাটের দশক  থেকেই, যা আজও একই রকম আছে।’
সামিনা চৌধুরী বলেন, ‘বাবা খুব সহজ-সরল মানুষ ছিলেন। আমরা বাবার মতো সেই সরলতার, বিশ্বাসের জায়গায় অবস্থান করতে চাই।  বাবার মৃত্যুবার্ষিকীতে সকল শ্রোতার কাছে সেই দোয়াই প্রার্থনা করি, যেন বাবার মতো গান গেয়ে মানুষের হৃদয়ে আজীবন থেকে যেতে পারি।’

Disconnect