ফনেটিক ইউনিজয়
ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে রিমোট কন্ট্রোল
এ আর সুমন

গত ৯ ডিসেম্বরের ঘটনা, সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা বাজে। তেজগাঁও এলাকা থেকে প্রবেশ করা বিজয় সরণি সিগন্যালের রাস্তায় বসে আছি দীর্ঘক্ষণ। রাস্তায় প্রচণ্ড যানজট, চারপাশে দাঁড়ানো দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশরা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। চারপাশের রাস্তার মুখে লাল-সবুজ বাতির ডিজিটাল লাইটের দিকে তাকানোর সময় কারোরই নেই। একদিকের সিগন্যাল ছাড়লে অন্যদিক দিয়ে বাইকাররা যেন ট্রাফিকের চোখ ফাঁকি দিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছেন, এর মধ্যে দেখলাম কয়েকজনকে ধরে মামলাও দেয়া হলো। উপয়ান্তর না দেখে সম্প্রতি রাজধানীর এ রকম ব্যস্ত সিগন্যালগুলোতে ট্রাফিকরা দড়ি টানিয়ে সিগন্যাল মানতে বাধ্য করছেন। এ অবস্থা দেখার পরও দায়িত্বরত একজন ট্রাফিকের কাছে জানতে চাইলাম রাজধানীর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে নতুন করে উদ্যোগ নেয়া রিমোট কন্ট্রোলড ব্যবস্থা চালুর ব্যাপারে। বললেন, আমাদের ট্রাফিক ব্যবস্থা সত্যিই সেদিন কার্যকর হবে, যেদিন থেকে সব শ্রেণির মানুষ এ ট্রাফিক বিষয়টিকে ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারবে, সবাই যখন সচেতন হবে তখনই ফল আসবে। এরইমধ্যে সিগ্যনাল ছাড়ার সময় হয়ে গেল, সাম্প্রতিক দেশকালের এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা শেষ করার আগেই তিনি রাস্তার মাঝখানে বেঁধে দেয়া রশি খুলতে চলে গেলেন।
এবার আসছি মূল প্রসঙ্গে। ঢাকার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে রিমোট কন্ট্রোল ব্যবস্থা চালু করতে আপাতত ছয়টি সিগন্যাল বাতি চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এরইমধ্যে মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক ডিভিশনের কাছে তা হস্তান্তর করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। বিষয়টি নিশ্চিত করেন ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপনকারী প্রকল্পের নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেইস) প্রকল্পের পরিচালক ও ডিএসসিসি’র নগর পরিকল্পনাবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম। এর আগে গত ৪ নভেম্বর প্রকল্প পরিচালক নগরীর ছয়টি ট্রাফিক সিগন্যাল রিমোট কন্ট্রোল পরিচালনার জন্য বুঝে নিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনারকে (ট্রাফিক) চিঠি দেন। ছয়টি পয়েন্টের মধ্যে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল ইন্টারসেকশন, কদম চত্বর ইন্টারসেকশন, মৎস্য ভবন ইন্টারসেকশন, কাকরাইল মসজিদ ইন্টারসেকশন, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ইন্টারসেকশন ও শাহবাগ ইন্টারসেকশন। ইতিমধ্যে কয়েকটি পয়েন্টের কাজ শেষের দিকে বলে জানা গেছে। রিমোট কন্ট্রোল ব্যবস্থার মাধ্যমে মূলত দুইটি বিষয় ঘটবে- সময় ও বাতি নিয়ন্ত্রণ। গাড়ির চাপ অনুযায়ী দূর থেকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সিগন্যালের সময় ডিজিটাল ডিসপ্লেতে দেখানো হবে। ফলে চালকরা বুঝতে পারবেন কতক্ষণ সেখানে অপেক্ষা করতে হবে।    
আরেকটি হলো, রিমোট কন্ট্রোল ব্যবস্থাতেই সিগন্যালের বাতিগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এতোদিন পর্যন্ত যেভাবে সেট করে দেয়া হতো সেভাবেই চলতো।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকার পর রাজধানীর সিগন্যাল বাতিগুলো মেরামত করে পুরো সিগন্যালিং ব্যবস্থাটি রিমোটের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করে যানবাহন চালানোর উদ্যোগ নেয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এজন্য পুলিশ ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে নির্দেশনা দেয়া হয়। সে কারণে সংস্থা দু’টি কাজও শুরু করেছে। এর আগে কয়েকটি পয়েন্টে পরীক্ষামূলক স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল বাতিতে যানবাহন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও করা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত তা সফলতার মুখ দেখেনি। এবার যন্ত্রের মাধ্যমে ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণের জন্য এরই মধ্যে কন্ট্রোলারের ডায়াগ্রামের পরিবর্তন আনা হয়েছে। রিমোট সিস্টেমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডায়াগ্রামের পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। প্রতিটি ইন্টারসেকশনের জন্য থাকছে দু’টি রিমোট। কয়েকটি যন্ত্রও পরিবর্তন করতে হচ্ছে।
ডিএমপি’র যুগ্ম-কমিশনার, ট্রাফিক (দক্ষিণ) মো. মফিজ উদ্দিন আহমেদ জানান, ডিএসসিসি ছয়টি সিগন্যাল বাতি বুঝে নেয়ার জন্য আমাদের চিঠি দিয়েছেন। আমরা সেগুলো বুঝে নেয়ার জন্য একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছি। কমিটি মাঠপর্যায়ে বিষয়গুলো বুঝে নিতে কাজ করছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যানজট নিরসনে ২০০১-২০০২ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট’ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮৮টি সড়ক মোড়ে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি বসানো হয়। নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেইস) প্রকল্পের মাধ্যমে সিগন্যাল বাতিগুলো স্থাপন করে সিটি করপোরেশন। কিন্তু বিভিন্ন ত্রুটির কারণে নির্মাণ শেষে এর ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। এতে যে সময় নির্ধারণ করে দেয়া ছিল, তার সঙ্গে বাস্তব যানবাহনের পরিসংখ্যানের কোনো সামঞ্জস্য ছিল না। সে কারণে বেশ কয়েকবার পরীক্ষামূলকভাবে ট্রাফিক বাতি চালু করা হলেও তা সফলতার মুখ দেখেনি। ২০০৮ সালের শেষের দিকে প্রকল্পটির কাজ শেষ হয়। সে সময় উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সমস্যার সৃষ্টি হয়। শহরে দেখা দেয় ভয়াবহ যানজট। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারায় পরে কাউন্টডাউন বন্ধ করে আগের মতো হাত দিয়ে সিগন্যাল ব্যবস্থায় ফিরে যায় ট্রাফিক পুলিশ। পরে ২০১০ সাল থেকে পাঁচবছর মেয়াদি প্রকল্পটির দ্বিতীয় দফায় অর্থায়ন করা হয়। মেয়াদ শেষ হয় ২০১৪ সালের জুনে। কিন্তু প্রকল্পটির সুফল পায়নি নগরবাসী। পরে তৃতীয় দফায় মেয়াদ আবারও বাড়িয়ে ২০১৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। এবার আসছে রিমোট কন্ট্রোলড ব্যবস্থা।
বিষয়টি নিয়ে সাম্প্রতিক দেশকালের সঙ্গে কথা হয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক সারওয়ার জাহানের। তিনি বলেন, ‘যানজট সৃষ্টির প্রধান কারণ ট্রাফিক আইনের প্রতি অবহেলা, অনীহা। বিশ্বের অন্যান্য দেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল পদ্ধতিতে বাতি জ্বলার সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি থামছে। কিন্তু আমাদের দেশে হয় কী, লালবাতি জ্বলছে, তারপরও কেউ গাড়ি থামাচ্ছে না, ট্রাফিক আইনকে কোনো রকম তোয়াক্কা করে না! মূলত স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল পদ্ধতি প্রথম থেকেই চালু করা দরকার ছিল, কিন্তু সেটা করা হয়নি। আবার এমন সময় চালু করা হলো যখন গাড়ির সংখ্যা অজস্র, এজন্য অভ্যাসটা গড়ে ওঠেনি। আইনের প্রয়োগ হচ্ছে না। কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নেই। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমত ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে পালন করতে হবে, চালকেরা যাতে মানতে বাধ্য হন, সে ব্যবস্থা করতে হবে।’

Disconnect