ফনেটিক ইউনিজয়
নির্বাচনী হাওয়ায় অপ্রত্যাশিত ব্যয়ের ২ হাজার কোটি টাকা!
ইমদাদ হক

ব্যাপকভাবে ফসলের উৎপাদন হ্রাস, অপ্রত্যাশিত বন্যা, খরা বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় অর্থ যোগানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ দুইহাজার কোটি টাকা। শেয়ারবাজার ধসের মাধ্যমে আর্থিকখাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে অর্থ সহায়তা দিয়ে পরিবেশ স্বাভাবিক রাখা এই বরাদ্দের লক্ষ্য। তবে এ ধরনের কোনো ঘটনা চলতি অর্থবছরে না ঘটলেও এরই মধ্যে খরচ হয়ে গেছে এ খাতের পুরো অর্থ। যদিও এখনও বছরের বাকি প্রায় সাত মাস। আর এমন ঘটনা ঘটেনি গত ১০ বছরের বাজেট ব্যবস্থাপনায়। এসব অর্থের বেশিরভাগই খরচ করা হয়েছে দৃশ্যমান অবকাঠামো তুলে ধরার লক্ষ্যে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন সামনে রেখে এ খাতের অর্থ ব্যয়ে তড়িঘড়ি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ভোটারদের সামনে হয়তো নতুন কিছু প্রকল্প দৃশ্যমান হবে। তবে এতে অর্থ অপচয়ের শঙ্কা থেকে যাবে। যাতে নিশ্চিত হবে না সুশাসন ও জবাবদিহিতা।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অপ্রত্যাশিত ব্যয় ব্যবস্থাপনা খাতের বরাদ্দ থেকে পুরো অর্থ ব্যয় হয়ে গেছে। অথচ গত অর্থবছরে এই খাতের পরিমাণ ছিল এক হাজার ২০০ কোটি টাকা। সেবার বাজেট সংশোধনের পরও এই খাতে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার মতো অব্যয়িত ছিল। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল দুই হাজার কোটি টাকা। অথচ বরাদ্দের পুরো অর্থ অক্টোবরের মধ্যেই ফুরিয়ে গেছে। ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যদি বরাদ্দের বাড়তি অর্থ দরকার হয়, তা অপ্রত্যাশিত ব্যয় ব্যবস্থাপনা খাত থেকে যোগানের লক্ষ্য ছিল। তাই গত বছরের চেয়ে ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানো হয় এ খাতে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বছর দু’য়েক আগে অকাল বন্যা ও পাহাড়ি বর্ষণে সারা দেশে ব্যাপকভাবে ফসলহানি হয়। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বেগ পোহাতে হয় কৃষকদের। সে বছর খাদ্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। ফলে চালের দাম বাড়ে হু হু করে। চাহিদা মেটাতে চাল আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়। ব্যবসায়ীরা সে বছর রেকর্ড পরিমাণ খাদ্যপণ্য আমদানি করেন। এরপর থেকে এ ধরনের দুর্যোগসহ অন্য সংকট মোকাবিলায় প্রতিবছরই অল্প অল্প করে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে অপ্রত্যাশিত ব্যয় ব্যবস্থাপনার খাতে। এ খাত থেকে বরাদ্দ নিতে মন্ত্রণালয় বা পরিকল্পনা কমিশনের কোনো অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না। পরিকল্পনা কমিশনেরও বিশেষ সহায়তা তহবিলে ২০০০ কোটি টাকার ভিন্ন আরেকটি বরাদ্দ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে মোটাদাগে দৃশ্যমান উন্নয়ন অবকাঠামো নির্মাণের প্রতি বাড়তি নজর দেয় সরকার। এর আওতায় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়। শিক্ষার্থীদের জন্য হোস্টেলও নির্মাণ করা হয়।    
যেগুলোর কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি, নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে সে সব প্রকল্প ও কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। যাতে প্রথম ও দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ ছাড় করে দেয়া হয়। চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) যেসব প্রকল্প স্থান পায়নি, কিংবা এসব প্রকল্প অননুমোদিত বরাদ্দবিহীন অবস্থায় আছে, সেসব প্রকল্প ও কর্মসূচিতে অর্থমন্ত্রণালয়ের এই বরাদ্দ থেকে অর্থ ছাড় করা হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সরকারের উন্নয়ন কর্মকা- তুলে ধরাই প্রধান লক্ষ্য বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। যার মাধ্যমে নতুন ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার মাধ্যমে সরকারপন্থীদের ভোটব্যাংক বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
এ বিষয়ে কথা হয় সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, প্রথমত বরাদ্দ নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে। সরকার এ অর্থবছরে এক লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার এডিপি বাস্তবায়ন করছে। এর বাইরে আবার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে এই খাত থেকে বরাদ্দ দেয়া মোটেও সমীচীন নয়। যেখানে বরাদ্দের পরিমাণ অতিপ্রাতুলতা বলেই মনে হয়। এ খাতের বরাদ্দ কমানো উচিত। আর এ অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও বাড়ানো উচিত।
অপ্রত্যাশিত ব্যয় ব্যবস্থাপনা খাত থেকে ছাড় করা অর্থের হিসাব বিবরণী থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, সবচেয়ে বেশি টাকা দেয়া হয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণায়লের আওতায় কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর সুবিধা বোর্ডের আওতায় জুন ২০১৭ পর্ষন্ত অনিষ্পন্ন আবেদনসমূহ নিষ্পত্তিতে। এসব খাতে মোট ছাড় করা হয়েছে ৫০০ কোটি টাকা। এছাড়া পুরাকীর্তি রোজ গার্ডেন কিনতে ৩৩১ কোটি ৭০ লাখ টাকা, যুক্তরাষ্ট্রে চ্যান্সারি ভবন কিনতে ৭০ কোটি ৫০ লাখ টাকা, রোমের চ্যান্সারি ভবন ও রাষ্ট্রদূতের বাসভবন কিনতে ১৩৫ কোটি টাকা, পাটকল শ্রমিকদের মজুরি ও বেতন-ভাতা পরিশোধে ১০০ কোটি টাকা, স্থানীয় সরকার বিভাগের দুই প্রকল্পে ৮৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্টকে ৭৯ কোটি টাকা, সংসদ সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বড় ভাই আবুল হাসনাত আবদুল্লাহকে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় ব্যয় ব্যবস্থাপনায় ২০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এছাড়া অবশিষ্ট অর্থ থেকে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের অনুকূলে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ৯৯ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়।
ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, চলতি বাজেটের থোক বরাদ্দ এতো তাড়াতাড়ি শেষ হওয়া অস্বাভাবিক। এখন আকস্মিক কোনো ঘটনা ঘটলে অর্থ যোগান দিতে সরকার বেকাদায় পড়বে। থোক বরাদ্দ থেকে রাজনৈতিক উদ্দেশে অর্থ খরচ করা উচিত নয়। সরকারের এখন এডিপিতে তালিকাভুক্ত বা চলমান উন্নয়ন প্রকল্প থেকে টাকা নিয়ে নির্বাচনের ব্যয় মেটাতে হবে। তাছাড়া সরকারের কোনো উপায় নাই।
অর্থ বিভাগ বলছে, আসন্ন নির্বাচনে ৪০ হাজার ১৯১টি ভোট কেন্দ্র ব্যবহার করা হবে। এ খাতে বরাদ্দের বাইরে খরচ হবে অতিরিক্ত ২৪৩ কোটি টাকা। এখন এ অর্থ যোগানের উৎস নিয়ে ভাবতে হচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সরকারের উপর মহল থেকে সিদ্ধান্ত এলে সেখানে যৌক্তিক কারণ তুলে ধরার সুযোগ থাকে না। যে কোনোভাবেই অর্থ যোগানসহ নির্দেশনা বাস্তবায়নে তটস্থ থাকতে হয় মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের। সেখানে অর্থব্যয়ের রাজনৈতিক বা অন্য উদ্দেশ্য নিয়ে ভাবনার সুযোগ মেলে না।

Disconnect