ফনেটিক ইউনিজয়
এক দশকে রাজনীতিকদের আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ
আনছার আহমেদ

বছর দশেক আগে রঞ্জিত কুমার রায়ের সম্পদ বলতে ছিল পৈতৃক ভিটাতে টিনের বাড়ি। হাতে নগদ ছিল ৭০ হাজার টাকা। তার স্ত্রী নিয়তি রায়ের ছিল ১৫ হাজার টাকার পাঁচ তোলা স্বর্ণ। যশোর-৪ আসনে এমপি হওয়ার পর গত ১০ বছরে রঞ্জিত রায়ের সম্পদ বেড়েছে শত গুণ। তাকে ছাড়িয়ে গেছেন তার স্ত্রী।
একাদশ সংসদ নির্বাচনের আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া রঞ্জিত রায়ের হলফনামা অনুযায়ী, তার স্ত্রী নিয়তি রায়ের রাজধানীর মিরপুরে দুই হাজার ৭১২ বর্গফুটের ফ্ল্যাট, যশোর শহরে তিনটি বহুতল বাড়ি, ৫০ লাখ টাকা দামের আরও দু’টি ফ্ল্যাট, ১৬ লাখ ১০ হাজার টাকা দামের ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ি, ব্যাংকে ১৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার ডিপিএস এবং ৩৪ লাখ ৪৫ হাজার টাকা আছে। রঞ্জিত রায়ের পূর্বাচলে ১০ কাঠার প্লট, কোটি টাকা দামের দু’টি জিপগাড়ি, ৯০ লাখ টাকার আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন এবং দুই কোটি ২৫ লাখ ৮০ হাজার টাকার আসবাব আছে। হলফনামা অনুযায়ী, এমপি রঞ্জিত এবং তার স্ত্রীর আরও অনেক সম্পদ রয়েছে।
শুধু রঞ্জিত দম্পতি নন, আরো শতাধিক এমপি গত একদশকে কোটিপতি হয়েছেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে আজকের নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান ছিলেন ঋণগ্রস্ত। তার স্ত্রীর আয় ছিল শিক্ষকতা থেকে মাসে পাঁচ হাজার টাকা। শাজাহান খান ও তার স্ত্রী দু’জনেই এখন কোটিপতি। নির্বাচন কমিশনে দেয়া হলফনামা অনুযায়ী, শাজাহান খান এখন ব্যবসায়ী।
১০ বছর আগে ২০০৮ সালের নির্বাচনে দেয়া হলফনামায় শাজাহান খানের মাসিক আয় ছিল ৫৭ হাজার টাকা। তখন তিনি ও তার স্ত্রীর হাতে নগদ টাকা ছিল না। ঋণ ছিল ৪২ লাখ টাকার উপরে। ১০ বছর মন্ত্রিত্ব করা শাজাহান খানের মাসিক আয় এখন প্রায় ২৮ লাখ টাকা! বছরে তার আয় তিন  কোটি ৩৩ লাখ টাকা।
শাজাহান খান ও তার স্ত্রীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টও ফুলে-ফেঁপে উঠেছে গত ১০ বছরে। ২০০৮ সালে তার অ্যাকাউন্টে জমা ছিল ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৬০৪ টাকা। তার স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে জমা ছিল ১২ হাজার ৪৭০ টাকা। এক দশক পর মন্ত্রীর ব্যাংকে জমা আছে এক কোটি ২৩ লাখ ৫২ হাজার ৩১১ টাকা। নগদ আছে ২৫ লাখ ৪২ হাজার ৪১৩ টাকা। স্ত্রীর নামে ব্যাংকে আছে ২০ লাখ ৯১ হাজার ৪৩৬ টাকা এবং নগদ রয়েছে ২৩ লাখ ৪৮ হাজার ৫৬৪ টাকা।  
রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা বলছেন, হলফনামায় এমপিদের দেয়া সম্পদের বিবরণ তাদের নিজস্ব তথ্য। এ তথ্য যাচাইয়ের দৃষ্টান্ত নেই। তাই তাদের সম্পদের পরিমাণ হলফনামায় দেয়া তথ্যের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। রাজনীতিবিদরাও ব্যবসায় নামায় তাদের সম্পদ বাড়ছে। এমন এমপি রয়েছেন- ১০ বছর আগেও যার কিছুই ছিল না, অথচ এখন ব্যাংকের মালিক। রাজধানীতে ফ্ল্যাট ও প্লটের মালিক হয়েছেন, যা তার আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এমপি নির্বাচিত হয়ে গত পাঁচ বছরে ২০৩ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করেছেন ঢাকা-৭ আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থী হাজী মোহাম্মদ সেলিম। অথচ হলফনামার তথ্যানুয়ায়ী, তিনি এত টাকা আয়ই করেননি!
হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে আইনানুযায়ী প্রার্থিতা বাতিল হবে। এমপি নির্বাচিত হলে তা বাতিল হবে। কিন্তু    হলফনামায় অসঙ্গতিপূর্ণ তথ্য দেয়ার অভিযোগে আজ পর্যন্ত কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নজির নেই। এ প্রসঙ্গে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, হলফনামায় দেয়া তথ্য সত্য কি না, তা যাচাই করার সক্ষমতা নেই নির্বাচন কমিশনের।
দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেছেন, চাইলেও কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায় না। অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করে দুদক ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু অভিযোগই পাওয়া যায় না রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে।
বর্তমান মন্ত্রিসভার ২৯ পূর্ণমন্ত্রীর ১৮ জনেরই সম্পদ বেড়েছে। তারা এবারের নির্বাচনেও প্রার্থী। গত পাঁচবছরে মন্ত্রীদের মধ্যে তুলননামূলক সম্পদ বৃদ্ধিতে এগিয়ে পাবনা-৪ এর এমপি ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ ডিলু। পাঁচবছর আগে তার স্থাবর ও অস্থাবর মোট সম্পদ ছিল এক লাখ ৩০ হাজার টাকার। এখন তিনি দুই কোটি ২৫ লাখ ৫৭ হাজার ২৬২ টাকার মালিক। প্রায় দুইশ’ গুণ বেড়েছে তার সম্পদ।
হলফনামা অনুযায়ী, গত ১০ বছরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের চেয়ে তার স্ত্রীর আয় বেড়েছে প্রায় ৪৮ গুণ। মন্ত্রী ও তার স্ত্রীর বার্ষিক আয়, ১ কোটি ২৫ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মোট অস্থাবর সম্পদ ৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮০ হাজার টাকার এবং স্থাবর সম্পত্তি ১ কোটি ১৪ লাখ ৪৫ হাজার টাকার। ১০ বছর আগে মন্ত্রীর সম্পদ না থাকলেও এখন তার হাতে নগদ টাকা আছে ৩৯ লাখ ৩৬ হাজার টাকা।
হলফনামায় বলা হয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও তার স্ত্রী বছরে ৩৮ লাখ টাকা বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স পান। মানে বছরে ৩৮ লাখ টাকা স্বজনরা মন্ত্রী ও তার স্ত্রীকে বিদেশ থেকে পাঠান। কে কে এত টাকা তাদের পাঠায় তার উল্লেখ নেই হলফনামায়।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) তথ্যানুযায়ী, বর্তমান সংসদে ৩০০ এমপি’র ২২৬ জনই কোটিপতি। ৬৯ শতাংশ এমপিই ব্যবসায়ী। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি জোটের ৬০০ প্রার্থীর হলমনামা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পাঁচ শতাধিকই ব্যবসায়ী। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের ৩০০ প্রার্থীর মাত্র ২০ জনের পেশা রাজনীতি। বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের মধ্যে মাত্র দুইজনের পেশা রাজনীতি।
সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, নির্বাচন এখন খুবই ব্যয়বহুল। যাদের টাকা আছে, তারাই নির্বাচনে আসছেন। দল করার সুবাদে যারা মনোনয়ন পেয়ে এমপি হতে পারছেন, তারাও টাকার মালিক হয়ে যাচ্ছেন। কীভাবে বিত্তবান হচ্ছেন- এ নিয়ে যখন কোনো প্রশ্ন নেই, তাই সবাই সুযোগ নিচ্ছে। হলফনামায় যে তথ্য দিয়েছেন, তাও যদি সত্য হয় তাহলে অনেকেরই সম্পদের সঙ্গতি নেই আয়ের সঙ্গে। কিন্তু কারো বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

Disconnect