ফনেটিক ইউনিজয়
ওপারের যাত্রী
হাসান তানভীর

নিতাইদাও যদি চলে যায় তাহলে কার ভরসায় থাকবে সে? এমনিতেই এই পাড়ায় হিন্দু পরিবার কয়েকঘর। তার মধ্যে তারাপদ জ্যাঠা বউ-ছেলে-পুলে নিয়ে ওপারে পাড়ি জমিয়েছে বর্ষার শুরুতেই। মনে হয়, এ পাড়ায় একটা হিন্দুও থাকবে না। নির্মলার লাশ যেদিন নদীতে পাওয়া গেলো, তারপর থেকে এ পাড়ার হিন্দুরা বুঝেছে- আর সময় নেই! সাজানো সংসার ছেড়ে, আজন্ম লালিত স্বপ্নগুলোকে চিতায় তুলে দিয়ে পাড়ি জমাতে হবে অজানার উদ্দেশ্যে। শৈশব-কৈশোর কেটেছে যে মাটিতে গড়াগড়ি খেয়ে, আজ তাদের সে মাটিতে বাস করার অধিকার নেই। মাটির মায়া বড় কঠিন। সহজে ছাড়া যায় না। তারাপদ জ্যাঠা যাওয়ার সময় চোখের জলে বুক ভাসিয়ে বলেছিলো- ‘বাবারে, আমার জান চইলা গেলেও আমি আমার গাঁয়ের মাটি ছাইড়া যাইতাম না। যাইতেছি খালি ওগো জন্যি। নিজির চোহের সামনে ওগো মাইরা হেলাবি এইডা আমি সহ্য করবার পারবো না বইলাই যাইতেছি।’ একটু দম নিয়ে তারাপদ জ্যাঠা আবার বলেছিলো- ‘তোমার বয়স কম। জীবনের অনেক কিছু দেহা বাহি আছে। কয়দিন হইলো বিয়া করছো। আমাগো সাথে চলো। এহেনে থাহা মানে জমের রাজ্যে থাহা।’ কথাটা শেষ করে তারাপদ আর দেরি করেনি। নৌকা ছেড়ে দিয়ে নির্বাক চোখে তাকিয়ে ছিলো নিজের বাড়ির দিকে। নকুল তাদের সাথে যাবে কি না তা আর জিজ্ঞেস করা হয়নি। ভিটেটা বোরহান শেখের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে সে। ও বাড়ি এখন আর তার নয়। কিন্তু কাগজের লেখায় কী আসে যায়। তারাপদ বিশ্বাস করে ওবাড়ি এখনো তার। সে বেড়াতে যাচ্ছে। ফিরে এসে আবার সবকিছু গুছিয়ে নেবে। সকালবেলা গরু নিয়ে চকে যাবে। মাটির হাঁড়ি-পাতিল তৈরি করে হাটে-হাটে ফেরি করবে। গ্রীষ্মের দুপুরে ডাবের ঠাণ্ডা জল খাবে। মাটির টান মনে হয় নাড়ির সাথে। এজন্যই সবাই মাটিকে মা বলে।
বর্ষাকালে পাল বাড়িতে ব্যস্ততা কম থাকে। সারাদিন বৃষ্টি হয় বলে মাটির জিনিসপত্র শুকানো যায় না। নকুলের আজ কাজ নেই। বাইরে টুপটাপ বৃষ্টি হচ্ছে। সীতা একটা কাঁসার বাটিতে গুড়-মুড়ি এনে দিয়েছে। বারান্দায় জল-চৌকিতে বসে তাই চিবুচ্ছে সে। সীতা বড় ভালো মেয়ে। সবদিকে তার সজাগ দৃষ্টি। নকুলের আরামের দিকে সব সময় খেয়াল রাখে সে। কেষ্টপুরের হরিপদ কর্মকার ছিলো হরিদাস পালের মিতা। হরিতে-হরিতে মিল! মিতার মেয়েকে ছেলের বউ হিসেবে পছন্দ করতো হরিদাস পাল। মিতাকে বলে রেখেছিলো তার পছন্দের কথা। নকুল বাপের মিতার মেয়েকে বিয়ে করেছে ঠিকই, কিন্তু বাপ তা দেখে যেতে পারেনি। বুড়োর শ্বাসের ব্যারাম ছিলো। গত শীতে কাশতে-কাশতে চিতায় গেছে।
নকুল নির্বিবাদী মানুষ। কারো সাথে হাঙ্গামায় জড়ানোর নজির নেই তার। পালবাড়ির ঐতিহ্য অনুসারে পৈতৃক ব্যবসা করে আর একটা গরু পালে। গরুটা গাভিন হয়েছে তিন মাস আগে। পালার খড় ফুরিয়ে গেছে। অল্প যেটুকু ছিলো তা বৃষ্টির পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। কিছু খড় ঘরের চালে দিতে হয়েছে। চালের ছন পচে ফুটো হয়ে গিয়েছিলো। বৃষ্টি হলে টুপটুপ করে পানি পড়তো। কিছু শুকনো খড় দিয়ে চালটাকে ঠিক করেছে। নকুলের স্বপ্ন একটা টিনের ঘর বানাবে। সেজন্য মনে মনে টাকা গুছিয়ে নিচ্ছে সে।
বৃষ্টি একটু ধরে এসেছে বোধ হয়। গরুটা নিয়ে বাইরে যাওয়া দরকার। কিন্তু কেউ একজনকে কচুপাতা মাথায় দিয়ে তার বাড়ির দিকে আসতে দেখে উঠা হলো না তার। একটু কাছে এলে দেখতে পেলো ফয়জুদ্দিন আসছে। ফয়জুদ্দিন নকুলের সমবয়সী। ছোটবেলা থেকে একসাথে বড় হয়েছে ওরা। বলতে গেলে গ্রামে নকুলের একমাত্র বন্ধু ফয়জুদ্দিন। বিলে গিয়ে মাছ ধরা থেকে শুরু করে রাত জেগে যাত্রা দেখা, নৌকা বাওয়া, তামাক খাওয়া সবকিছুতে নকুলের সঙ্গী ফয়জুদ্দিন। কৈশোরে বিড়ি খেতে গিয়ে একবার হরিদাসের কাছে ধরা পড়েছিলো তারা। নকুলই হরিদাসের পকেট থেকে বিড়িটা চুরি করে এনেছিলো। ছেলেকে বিড়ি হাতে দেখে- ‘তবে রে...’ বলে তেড়ে এসেছিলো হরিদাস। ফয়জুদ্দিন নকুলকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলো সেদিন। বলেছিলো- ‘জ্যাঠা, ওর কোনো দোষ নাই। আমি বিড়ি আইনা ওরে বুলাইছিলাম। ওরে কিছু কইয়েন না।’ হরিদাস তখন কিছু বলেনি। কিন্তু পরে ছেলেকে নিষেধ করে দিয়েছিলো ফয়জুদ্দিনের সাথে না মিশতে। হরিদাসের সে নিষেধাজ্ঞা কোনো কাজে আসেনি। দুই বন্ধুর জুড়ি এখনো টিকে আছে।
ফয়জুদ্দিন বারান্দায় এসে দাঁড়ালে নকুল সীতাকে বললো একটা পিঁড়ি এনে দিতে। সীতা ঘর থেকে পিঁড়ি এনে দিলো। নকুল ফয়জুদ্দিনের দিকে মুড়ির বাটিটা এগিয়ে দিয়ে বললো- ‘কিরে ফইজা, এই বৃষ্টির মধ্যে কোহন থাইকা আইলি। বিষয় কী?’
-‘খবর আইছে থানার মিলিটারি ক্যাম্পে আরো মিলিটারি আইছে। ওরা এলাকায় অভিযানে নামবি মুক্তিবাহিনী আর তাগো পক্ষের লোকগো ধরার জন্যি। নকুইল্যা, তোর পায়ে ধরি তুই নিতাইদার সাথে ভারত চইলা যা।’ মুড়ির বাটিটা একপাশে সরিয়ে রেখে বললো ফয়জুদ্দিন। তার চোখেমুখে মিনতি ও আতঙ্ক মিশে গিয়ে ভিন্ন এক মিশ্র-অনুভূতি তৈরি হয়েছে।
‘কী কস তুই। নিজের বাড়িঘর রাইখা কই যাবো? মিলিটারি আমারে মারবি ক্যা? আমি কী দোষ করছি?’ অবাক চোখে কথাটা বললো নকুল। সে মুড়ি চিবাচ্ছিলো। ফয়জুদ্দিনের কথা শুনে চিবানো বন্ধ হয়ে গেছে। বুঝতে পারে- পাকিস্তান মুসলমানের দেশ, এখানে হিন্দুদের অধিকার কই? অসহায় বোধ করে নকুল। যে মাটিতে তার চৌদ্দ-পুরুষের বসবাস, সে মাটিতে তার থাকার অধিকার নেই এটা কী করে সম্ভব? ‘আমার যে যাইতে ইচ্ছা করে নারে ফইজা। মইরা যাবো তবু বাপের ভিটা ছাইড়া যাবো না। যে মাটিতি আমার বাপ-মায়ের ছোঁয়া লাইগা আছে তা ছাইড়া আমি ক্যামায় যাবো ক? আমারে মাপ কর ভাই। ভগবান কপালে যা রাখছে তাই অবি।’
বুক ফেটে আসে নকুলের। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে তরল দুটি স্রোত। ফয়জুদ্দিন কথা খুঁজে পায় না। ওর বুকেও যে বরফ জমে নেই তা কে বলবে। উঠে দাঁড়ায় ফয়জুদ্দিন। সীতা ওকে মুড়ি খেয়ে যেতে বলে। কিন্তু মুড়ি চিবানোর মতো আর্দ্রতা ওর মুখে নেই।
নিতাইদা আজ চলে যাচ্ছে। ওকে স্টেশন পর্যন্ত নৌকায় করে পৌঁছে দেওয়ার জন্য নকুল আর ফয়জুদ্দিন সাথে চলেছে। একেতো নিম্নাঞ্চল। আবার বর্ষাকাল হওয়াতে চারদিকে শুধু পানি আর পানি। নৌকা ছাড়া চলাচলের কোনো উপায় নেই। নিতাইদার বউ মুসলিম বৌদের সাজে নিজেকে আড়াল করে আছে। একটা ছয় বছরের ছেলে আর একটা তিন বছরের মেয়ে মায়ের কাছে জড় হয়ে বসে আছে। নকুল লগি ঠেলছে। নৌকাটা ওরই। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া। হরিদাসের আমল থেকে এটা দিয়ে মাটির জিনিসপত্র হাটে আনা নেওয়া হচ্ছে। কেউ কোনো কথা বলছে না। বিদায়ের মুহূর্তে অনেক কিছু বলতে ইচ্ছা করলেও কিছু বলা যায় না। মুখ আড়ষ্ট হয়ে আসে।
হঠাৎ একটা ট্রলারের আওয়াজ শুনে ফিরে তাকালো ওরা। তাকিয়েই ভয়ের একটা শিহরণ বয়ে গেলো সবার মেরুদ- দিয়ে। ট্রলারে পাকিস্তানের পতাকা উড়ছে। ওদেরকে এড়ানোর কোনো উপায় নেই। কারণ, নকুলের নৌকায় ইঞ্জিন নেই। অন্যদিকে ওটা ইঞ্জিনওয়ালা নৌকা। পাঁচ মিনিটের মধ্যে ওদের কাছে পৌঁছে গেলো নৌকাটি। নৌকায় পাকিস্তানি সৈন্যরা বন্দুক উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সাথে আছে রাজাকার কমান্ডার হারুন খাঁ। আগে ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার ছিলো সে। ওফাদারির নিদর্শন হিসেবে মাথায় জিন্না টুপি পরেছে লোকটা। গতকাল রাতে মুক্তিবাহিনী নৌকায় করে সেনাক্যাম্পে হামলা করেছে। ক্যাম্প কমান্ডার তাই হুকুম দিয়েছেন এলাকার সমস্ত নৌকা সিজ করতে। যেনো পরবর্তীতে আর মুক্তিবাহিনী এভাবে আক্রমণের সুযোগ না পায়। নৌকা থামাতে নির্দেশ দিলো হারুন খাঁ। নকুল নৌকা থামাতে বাধ্য হলো। হারুন জিজ্ঞেস করলো- কই যাস তোরা?
‘কুটুম বাড়ি যাই মেম্বার সাব।’ উত্তর দিলো ফয়জুদ্দিন। - ‘আরে ও নিতাই না? এতো গাঁট্টি বোচকা নিয়া কই যাও? ভারত যাবানি?’
‘না সাব। ভারত যাবো ক্যা? কুটুম বাড়ি যাই।’ ভয়ে বিবর্ণ হয়ে বললো নিতাই। তার কথা মুখে আটকে যাচ্ছে। -‘আর মিথ্যা কথা কইস না। বোরকা পরা মাইয়া যে তোর বউ, তা আমার বোঝা সারা। তোরা আমারে মিথ্যা কথা কইছস। আমারে ঠকাইছস। তোগো মরতি অবি।’ একথা শুনে  প্রাণভিক্ষা চাইলো ফয়জুদ্দিন। বললো- মেম্বার সাব আমাগো মাইরেন না। আপনি তো জানেন আমি মুসলমান। আর ওরাও কলমা পইড়া মুসলমান হইছে দুইদিন আগে। আমাগো প্রাণভিক্ষা দেন। আমরা জানি আপনারা মুসলমানগো মারেন না।
-‘আমরা মুসলমানগো মারি না তোরে কেডা কইছে?’
‘মাইনষের কাছে শুনছি মেম্বার সাব।’
-‘শোনা কথা বিশ্বাস করতে নাই। শোনা কথা বলা বিরাট পাপ!’
ফয়জুদ্দিনকে আর কথা বলার সুযোগ দেওয়া হলো না। নকুল আর নিতাই হরি নাম জপতে শুরু করেছে। হঠাৎ ট্যাট-ট্যাট-ট্যাট আওয়াজ হলো। একজন সৈন্য স্টেনগানটা ঘুরিয়ে নিলো মানুষগুলোর দিকে তাক করে। নকুল অনুভব করলো সে পানিতে পড়ে গেছে। কিন্তু তার ভেসে উঠার শক্তি নেই। তার চোখের সামনে সীতার মুখখানা ভেসে উঠলো। সে তাকিয়ে আছে পুকুরপাড়ের নারিকেল গাছের দিকে। ওখানে একটা শকুন এসে বসেছে। ওটাকে তাড়াতে হবে!

Disconnect