ফনেটিক ইউনিজয়
‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ এক গণদাবির গান
গাজী মাজহারুল আনোয়ার
----

জয়বাংলা বাংলার জয়
জয় বাংলা বাংলার জয়
হবে হবে হবে হবে নিশ্চয়
কোটিপ্রাণ একসাথে জেগেছে অন্ধরাতে
নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময়...


এমন একজন বাঙালি খুঁজে পাওয়া যাবে না, যিনি এই গানটি শোনেননি। এ গানের মধ্যদিয়ে মুক্তিসংগ্রামে উদ্দীপ্ত হয়ে এগিয়ে যায় বাংলার ছাত্র, কৃষক, শ্রমিকসহ সবশ্রেণি-পেশার মানুষ। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার মধ্যে আগুন জ্বালিয়ে দেয়, যে আগুনে স্বাধীন দেশে নতুন সূর্য ওঠে। এ কারণে ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ গানটিকেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রণসংগীত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের এই গানটি সূচনা সংগীত হিসেবে এবং জাতীয় সেøাগান হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বাংলা গানের কিংবদন্তিতুল্য গাজী মাজহারুল আনোয়ার এ গানের গীতিকার। তিনি শুধু একজন ব্যক্তি নন, যেন নিজেই শিল্প-সংস্কৃতির এক প্রতিষ্ঠান। স্বাধীনতা ও দেশপ্রেম নিয়ে অসংখ্য কালজয়ী গানের স্রষ্টা তিনি। তৎকালীন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির বঞ্চনা-দুর্দশা আর স্বপ্ন-আকাক্সক্ষাকে গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার আশ্চর্য ছন্দময় কুশলতায় কয়েকটি কথায় আবদ্ধ করেছিলেন- ’জয় বাংলা বাংলার জয়’। অনন্যসাধারণ মেধা ও প্রজ্ঞায় গানটিতে সুর সংযোজন করেছিলেন আনোয়ার পারভেজ।
সাম্প্রতিক দেশকাল তাঁর কাছেই জানতে চেয়েছিল- এ গানের পেছনের গল্পটা কী? কিভাবে এলো এ গানের কথাগুলো?
গাজী মাজহারুল আনোয়ার বলেন, বয়স কম থাকার কারণে আমি ভাষা আন্দোলনের সংগ্রামে যুক্ত হতে পারিনি। এই বিষয়টা আমাকে সবসময় কষ্ট দিত। আমি ভাবতাম আমার জন্মটা যদি আরেকটু আগে হতো, তাহলে ওই সংগ্রামে আমিও থাকতে পারতাম, এ বিষয়গুলোই ভাবতে থাকতাম। ভাবলাম, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমার কিছু করতে হবে। ১৯৭০ সালের মার্চের দিকে লেখা হয় এই গানটি। তবে দিন-তারিখ ঠিক মনে নেই। সময়টা খুব উত্তাল ছিল। চারদিকে থমথমে অবস্থা। ঘরের বাইরে গেলে ঘরে ফিরবো কি-না, তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। সবার প্রাণে একটাই আকাক্সক্ষা- বিজয়। কোটি মানুষের একটাই চাওয়া- স্বাধীনতা। এর মধ্যে যার কাছে যা কিছু আছে, তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান বঙ্গবন্ধুর। আমরা বঙ্গবন্ধুর কথা শুনেছিলাম, তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম।  যার কাছে সুর ছিল, সে গান নিয়ে এসেছে। আমাদের হাতে কলম ছিল, আমরা কলম নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছি। জহির রায়হান ক্যামেরা নিয়ে কাজে নেমেছেন। আসলে সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল এই স্বাধীনতা। তখন আসলে গানটি লিখতে হয়নি, এমনিতেই আমার কলম দিয়ে গানের কথা বেরিয়ে গেছে। ওই সময়ে প্রত্যেকটা মানুষের মনের কথাগুলো শুধু এক হয়ে একটি গান হয়ে গেছে। এটি ছিল একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির প্রাণের গান।  
তিনি আরো বলেন, ‘জয় বাংলা’ শব্দ যুগল কিন্তু ১৯৭১ সালে আসেনি, আরো আগেই এসেছে। ‘জয় বাংলা’ একটি স্লোগান, মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান, স্বাধীনতার স্লোগান। ১৯৭১ সালের সবচেয়ে উদ্দীপক স্লোগান। প্রকৃত অর্থে এ স্লোগান ছিল মুক্তিযুদ্ধের। এটি ছিল স্বাধীনতার সমার্থক। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটির আবির্ভাব ১৯৬৯ সালে। প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৬২ সালে ‘জয় বাংলা’ শিরোনামে ছাত্রদের হাতে লেখা একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এর অনেক পরে ১৯৭০ সালের দিকে এটি স্লোগানে রূপ নেয়, এ স্লোগানটি মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান হিসেবে জনপ্রিয়তা পেতে থাকে। তবে স্লোগানটি জনপ্রিয়তার চূড়ান্ত রূপ পায়, যখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ গানটি প্রচার হতে থাকে। পরে চলচ্চিত্রের গান হিসেবে এটি ব্যবহার করা হয়।
গাজী মাজহারুল আনোয়ার বলেন, ১৯৭০ সালে চলচ্চিত্র প্রযোজক আবুল খায়ের ‘জয় বাংলা’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেন। যার গল্প হবে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত বাঙালির মুক্তির সনদ নিয়ে। চিত্রপরিচালক ফকরুল আলম সে মোতাবেক চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য তৈরি করেন এবং ছবির গান লেখার দায়িত্ব পাই আমি। কিন্তু ঝামেলা লাগলো অন্য জায়গায়। তৎকালীন পাকিস্তান সামরিক সরকারের পক্ষে ‘জয় বাংলা’ নামে কোনো চলচ্চিত্র প্রদর্শনের অনুমতি প্রদান করার কথা ভাবাও সম্ভব ছিল না। তখন আমরা ভাবলাম তাহলে কি আমাদের চেষ্টা বিফলে যাবে? না। আমরা তবু আশা দেখতে শুরু করলাম। যদিও সে সময় জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল পাকিস্তান সরকার।  অবশেষে স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ২৬ জানুয়ারি মুক্তি পেয়েছিল চলচ্চিত্রটি।
তিনি আরো বলেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়েই ভাবছিলাম। আমি আর আনোয়ার পারভেজ বেশির ভাগ সময় একসাথেই থাকতাম। আমি ওর পেটে শুইতাম, ও আমার পেটে শুইতো। গানের মুখটা লিখেই আমি আনোয়ার পারভেজকে বললাম, হারমোনিয়ামটা বের কর, জয় বাংলা স্লোগানের সুরটা মাথায় রেখেই আনোয়ার সুর করল, কোথা থেকে যেন আলতাফ মাহমুদ ছুটে এসে বললো এই গানটা এই জায়গাতেই রাখা যাবে না, গানটা শেষ করতে হবে। ডাকো সবাইকে, আলতাফ ভাই নিজেই সবাইকে ডাকলো, শাহানাজ রহমতুল্লাহ তখন অনেক ছোট, আব্দুল জব্বারকে ডাকা হলো, আধাঘণ্টার মধ্যে গানটি লেখা, সুর করা এবং গাওয়া হলো। এ রেকর্ডের মাধ্যমেই ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ গানটি জনপ্রিয় হয়। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ চলাকালে প্রতিদিন স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে অনুষ্ঠান শুরুর আগে ও পরে বাজানো হতো গানটি। তখন থেকেই গানটি সবার হয়ে গেল। এটা শুধু আন্দোলনের গান নয়, এটি এক গণদাবির গান।
তিনি আরো বলেন, আমার আরেকটা গান আছে, সেটা স্বাধীনতার পরে লেখা, ‘একতারা তুই দেশের কথা বলরে এবার বল’, গানটি তরুণদের উদ্দেশ্যেই লিখেছিলাম। এখন সময় দেশের গান গাইবার। সমস্ত হিংসা ভুলে দল-মত নির্বিশেষে এক কাতারে দাঁড়িয়ে দেশের গান গাইলে, দেশের জন্য কাজ করলেই দেশের সমৃদ্ধি আসবে। তাছাড়া যারা শহীদ হয়েছেন, তারা কষ্ট পাবেন। অন্তত তাদের কথা ভেবেও আমাদের এক কাতারে আসতে হবে, দেশকে ভালোবাসতে হবে।
২২ হাজারের বেশি গানের স্রষ্টা গাজী মাজহারুল আনোয়ার ১৯৪৩ সালে ২২ ফেব্রয়ারি কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করেন। মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলেও পড়াশোনা শেষ করেননি। ১৯৬৪ সাল থেকে রেডিও পাকিস্তানে গান লেখা শুরু করেন তিনি। ১৯৬৫ সাল থেকে যুক্ত হন চলচ্চিত্রে। পরিচালনা ও প্রযোজনাও করেছেন বেশকিছু নাটক ও চলচ্চিত্র, ৪০টিরও বেশি চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে তার রচনায়। বিবিসি’র জরিপে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠকালের গান হিসেবে ২০টি গানের মধ্যে তাঁর রচিত তিনটি গান স্থান পায়েছে- ‘একতারা তুই দেশের কথা’, ‘একবার যেতে দে না’ এবং ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’।
সাক্ষাৎকার : সুলতান মাহমুদ সোহাগ

Disconnect